শফিক মুন্সি ::
নগরীর ছিন্নমূল বাসিন্দা নূরজাহান। পথে পথে ভিক্ষা করেন আর রাতে ঘুমান লঞ্চ টার্মিনালের পল্টুনে। করোনার প্রাদুর্ভাব রুখতে নগরবাসী ঘরে বন্দী। তাই নূরজাহানের জীবিকা নির্বাহ এক প্রকার বন্ধ। আয় বন্ধ হলেও মুখ বন্ধ করার উপায় নেই কোনো৷ কারণ পেটের দায় বড় দায়। গত এক সপ্তাহ যাবৎ কোনোদিন খালিপেট কোনোদিন আধপেটা হয়ে কাটাতে হয়েছে তাকে৷ লঞ্চ টার্মিনালে অবস্থান করা এইসব ছিন্নমূল মানুষদের জন্য গত দুদিন ধরে দুপুরে খাবার ব্যবস্থা করেছে নদী বন্দর কর্তৃপক্ষ। সেই কর্মসূচিতে আমার দেখা হলো ষাটোর্ধ্ব নূরজাহানের সঙ্গে।
করোনা ভাইরাস সম্পর্কে জানেন কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ” একটা রোগ আইছে মাইনষে কয়। লোকজনে সবাই বাড়িত আটকা পড়ছে। বাইরে বাইরায় না। ” এই সময়ে আপনার রোজগারের কি খবর জানতে চাইলে বেরিয়ে আসে আরো ভয়াবহ তথ্য। আবাসহীন ছিন্নমূল নূরজাহান বলেন, ” মোডে ইনকাম নাই বাজান।মাইনষের ঘরে ভাত চাইলে খাওয়াইতে ভয় পায়। মনে করে মোর বুজি হেই রোগ। হোডেল গুলাও থাহে বন্দ খাইতে পারি না। মুই দুইডা খাইয়া বাঁচতে চাই বাজান”৷
নদী বন্দর কর্মকর্তা আজমল হুদা মিঠু জানান, গত বুধবার থেকে ছিন্নমূল ও নিম্নআয়ের যেসকল মানুষ টার্মিনালে রাত কাটায় তাদের জন্য প্রতিদিন খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ” নদী বন্দরের শ্রমিকদের ২০০ পরিবারকে চাল- ডাল দিয়ে সহায়তা করা হয়েছে। কিন্তু এখানে রাতে ঘুমিয়ে থাকে এমন কিছু মানুষ আছে যাদের রান্না করে খাবার ব্যবস্থা নাই। ছিন্নমূল এসব মানুষদের অন্যত্র যাবারও উপায় নেই আবার বর্তমানে আয়-বাণিজ্যও বন্ধ। তাদের জন্য প্রতিদিন একবেলা রান্না করে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেছি আমরা”।
এই কর্মকর্তা নিশ্চয়তা দিলেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই ব্যবস্থা চলমান থাকবে। নগরীর বিভিন্ন সামাজিক – সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সরকারি দপ্তরগুলো এই বিপর্যয়ে জনগণের পাশে দাঁড়ানো শুরু করেছে। নিম্ন ও স্বল্প আয়ের মানুষদের জন্য ত্রান সামগ্রী বিতরণও শুরু করেছেন কিছু মানুষ । এছাড়া ব্যক্তিগত উদ্যোগে কয়েকটি জায়গায় ছিন্নমূল মানুষদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করার খবর পাওয়া গেছে। কিন্তু জনগণের বিপদে-আপদে পাশে থাকার বুলি আউড়ানো রাজনৈতিক নেতারা দেখাচ্ছেন নিষ্ক্রিয়তা। সর্বোচ্চ দেখাচ্ছেন জনসচেতনতায় লিফলেট বিলির কার্যক্রম। করোনার প্রভাবে আয়হীন কিংবা ক্ষুধায় জর্জরিত মানুষদের জন্য নেই বড় দলগুলোর কোন পদক্ষেপ। কিন্তু এমন সংকটে তাদেরকেই সবচেয়ে বেশি পাশে চেয়েছিল নগরীর ছিন্নমূল, নিম্নআয়ের ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষেরা।
ছোট দল বাসদের বরিশাল জেলা শাখার কিছু কার্যক্রম দৃশ্যমান হয়েছে৷তারা গত চারদিনে ১১০০ নিম্ন আয়ের পরিবারকে জরুরী খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছে বলে জানা গেছে। সংগঠনটির সদস্য সচিব ডা. মনীষা চক্রবর্তী জানান, ১৮ই মার্চ থেকে করোনা প্রতিরোধে নগরবাসীর জন্য কাজ করে যাচ্ছে তাঁর সংগঠন। তবে এই সংকটময় মুহূর্তে সরকারি সহায়তার বাইরে গিয়ে বৃহৎ পরিসরে মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ” খাদ্য সরবরাহ কিংবা আপৎকালীন সহায়তা বাদ দিয়ে নিম্নআয়ের মানুষদের ঘরে রাখা সম্ভব নয়।আর তাদেরকে ঘরে না রাখতে পারলে করোনা পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে৷ তাই সরকারের কাছে আমাদের স্পষ্ট দাবি গরীব এবং দুঃস্থ মানুষদের জন্য রেশনিং পদ্ধতি চালু করা হোক। এছাড়া নাগরিকদের বাসায় থাকতে গিয়ে আয়ের ওপর যেন গুরুতর প্রভাব না পড়ে সেটাও সরকারকেই দেখতে হবে”৷
ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা চুপচাপ মুজিব জন্মশতবার্ষিকী উৎযাপনের পর থেকেই। তাদের মনোনীত জনপ্রতিনিধিরা অবশ্য গত কয়েকদিন ধরে কিছুটা সরব হয়েছেন। সিটি কর্পোরেশন মেয়রের পক্ষ থেকে চল্লিশ হাজার দুঃস্থ মানুষকে ত্রাণ সহায়তা দেবার ঘোষণা এসেছে৷ পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও সদর সাংসদ কয়েকদিন দরে করোনা টেস্টের ল্যাব স্থাপনের জন্যও দৌঁড়ঝাপ করেছেন। তবে এতবড় দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের ব্যক্তিগত আর্থিক সক্ষমতা থাকলেও তাদেরকে কোনো মাত্রার ত্রাণ সামগ্রী দিতে দেখা যায় নি। এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে বরিশাল জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মোঃ ইউনুস বলেন, ” সরকার তো প্রতিনিয়ত এই বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। দলীয় নেতাকর্মীরা সরকারি এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবে”।
বিএনপির পক্ষ থেকে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণের কোন সংবাদ এখন অব্দি পাওয়া যায় নি।জেলা ও মহানগর পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায় তারা কেন্দ্রীয় নির্দেশনার অপেক্ষায় আছেন। তবে মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জিয়া উদ্দিন শিকদার জানান,কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মজিবর রহমান সরোয়ার এবং তাদের অঙ্গ সংগঠন থেকে জনসচেতনতামূলক লিফলেট এবং মাস্ক বিতরণ করা হয়েছে। দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক দ্রুতই বরিশালের নেতাকর্মীরা জনগণের পাশে গিয়ে দাঁড়াবেন।
একই অবস্থা এখানকার জাতীয় পার্টি নেতৃবৃন্দের । দলটির বরিশাল জেলা আহবায়ক মহাসিনুল ইসলাম হাবুলের বরাতে জানা যায় লিফলেট বিতরণ ছাড়া দৃশ্যমান কোনোকিছু তারা এখনো করেন নি। তিনি বলেন, ” করোনা দূর্যোগে সাধারণ এবং খেটে খাওয়া মানুষদের কষ্ট আমরা উপলব্ধি করি। তবে আমাদের একটা দাবি ছিল এই সংক্রামক দূর্যোগে ত্রাণ সামগ্রী যেন কেন্দ্রীয় ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে প্রদান করা হয়। ত্রাণ পৌঁছাতে গিয়ে আমরা যেন ভাইরাসটিকে সংক্রামিত না করি সেটা লক্ষ্য রাখাও তো জরুরী”।
শহরের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ইসলামি শাসনতন্ত্র আন্দোলনের (চরমোনাই) জনসমর্থন সবচেয়ে বেশি। নিম্নআয়ের মানুষদের জন্য তাদের শাখা সংগঠনও আছে। কিন্তু করোনার প্রভাবে শহরের নিম্ন ও স্বল্প আয়ের মানুষদের জীবিকার ওপরে ইতোমধ্যে প্রভাব পড়লেও সংগঠনটির পক্ষ থেকে নেওয়া হয় নি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ। অন্য দলগুলোর মতো শুধু সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নগরীতে লিফলেট বিতরণ করেছেন তারা৷ সংগঠনটির বরিশাল মহানগর সভাপতি রেজাউল করীম জানিয়েছেন আগামী সপ্তাহ থেকে ৩০ টি ওয়ার্ডের দুঃস্থ মানুষদের