• ২১শে জুন, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ , ৭ই আষাঢ়, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

অরক্ষিত বরিশাল : ঢাকা-নারায়নগঞ্জ থেকে আসছে মানুষের স্রোত

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত এপ্রিল ১২, ২০২০, ১৮:৩৭ অপরাহ্ণ
অরক্ষিত বরিশাল : ঢাকা-নারায়নগঞ্জ থেকে আসছে মানুষের স্রোত

সাঈদ পান্থ
মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে করোনা ভাইরাস। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বরিশালের প্রশাসন দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু তারপরও ঠেকানো যাচ্ছে না ঢাকা, নারায়নগঞ্জ ও মাদারীপুর থেকে আসা মানুষের ¯্রােত। যানবাহন ও নৌ যান বন্ধ থাকার পরও অবৈধ নৌযান ও পন্য পরিবহনের ট্রাক ও মিনি ট্রাকে করে বরিশালে আসছেন। মূলত ঢাকা, নারায়নগঞ্জ ও মাদারীপুরে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ায় নিরাপদ স্থান হিসেবে বরিশালকে বেছে নিচ্ছিন তারা। আর তাদের এই সিদ্ধান্তের কারণে যে কোন মুহূর্তে ভয়ালরূপ নিতে পারে বরিশাল। এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে রাখতে বিভাগের প্রতি জেলায় বহিরাগতদের প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দিয়েছেন জেলা প্রশাসকরা। এমনকি বিভাগীয় প্রশাসনও এই বিভাগে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য পিরোজপুর, মাদারীপুর ও ভোলায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে। প্রাণঘাতী মহামারি করোনাভাইরাস ঠেকাতে সরকার ৪র্থ দফায় ছুটি বাড়ালেও সচেতন হচ্ছে না বরিশালের মানুষ। গত সপ্তাহের শেষ থেকে প্রতিদিন বরিশালে করোনা আশংকায় রোগী ভর্তির সংখ্যা বাড়ছে। এরই মধ্যে বিভাগের ঝালকাঠি, পটুয়াখালী ও বরগুনায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার ইয়ামিন চৌধুরী বলেন, যারা বিভাগের বাহির থেকে আসছেন, তাদের ঠেকাতে নৌ পুলিশ ও কোস্টাগার্ডকে বলা হয়েছে। আগের চেয়ে এর হারও কমেছে। তারপরও দুই একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে। নিচ্ছিদ্রভাবে ঠেকানো যাচ্ছে না। যারা ধরা পড়ছে তাদের প্রাতিষ্টানিক কোয়ারেন্টাইনে রাখা হচ্ছে। তাদের বিভিন্ন স্কুল ও সাইক্লন সেন্টারে ১৪ দিন আটকে রাখা হচ্ছে। বিশেষ করে পটুয়াখালী, বরগুনা ও পিরোজপুরে প্রাতিষ্টানিক কোয়ারেন্টাইনে রয়েছে কয়েকশ মানুষ।
সম্প্রতি বরিশাল জেলা প্রশাসন থেকে জেলার প্রবেশ দ্বার ও বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে বরিশাল নগরের প্রবেশের পথই বন্ধ করে দেয়ার দাবি করা হয়েছে। কিন্তু বা¯Íবতা হচ্ছে দায়সারা সেই ঘোষণা আমলেই নেয়নি নগরবাসী। প্রতিদিনই শত শত মানুষ নগরীতে নানা অজুহাতে প্রবেশ করছে। বরিশাল নগরীর সিএন্ডবি রোড চৌমাথা এলাকায় পুলিশের পক্ষ থেকে একটি চেকপোস্ট বসানো হলেও যাত্রীরা চেকপোস্টের একটু আগে গাড়ি থেকে নেমে পায়ে হেঁটে সেই বাধা পার হচ্ছেন। অটো চালক মো: নাসির বলেন, পরিস্থিতি বদলানোর পর থেকে এভাবেই প্রতিদিন যাত্রী পরিবহন করি। ভোরে রা¯Íায় পুলিশ থাকে না তখন চলাচল করতে সুবিধা বেশি। আর বড় বড় রা¯Íায় উঠা যায় না। তাই অলিগলির রা¯Íায় চলাচল করতে হয়। তিনি আরো বলেন, আমরাও তো রা¯Íায় নামতে চাই না। কিন্তু পেটের দায়ে নামতে হয়। বটতলা এলাকার বরিশাল পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের ছাত্র রাইসুল ইসলাম বলেন, নানা মাধ্যমে মানুষ বরিশালে আসছে। আমাদের শিÿা প্রতিষ্ঠান বন্ধ দিলেও ঝুকিঁ কমছে না। বিশেষ করে নৌ পরিবহনে (ট্রলার) মানুষ আসছে বরিশালে। নারায়নগঞ্জ ও মাদারীপুর থেকে বেশি মানুষ আসছে। যে কোন সময় বরিশালেও ভয়াবহতা আসতে পারে।
বরিশাল নগরীর ৫নং ওয়ার্ড পলাশপুরের ৩নং গলির আল মোজাদ্দিয়া ছেছানিয়া রহমতউল¬াহ জামে মসজিদ সংলগ্ন ইঞ্জিন চালিত রিকসা চালক মিন্টুর বাসায় নারায়নগঞ্জ থেকে আসা নিকটতম আত্বীয় আশ্রয় নেয়ার কারনে এলাকার ভিতরে বসবাসকারী স্থানীয় বাসিন্দাদের ভিতর করোনা আতঙ্কে ছড়িয়ে পড়ে। কাউনিয়া থানা পুলিশের দায়ীত্বশীল কর্মকর্তা এলাকা পরিদর্শন করে নিজ ঘড়ে অবস্থান করার জন্য সতর্ক করে দিয়ে আসে। উক্ত ঘটনায় স্থানীয় যুবক সদস্যরা পলাশপুরের ৩নং গলি থেকে শুরু করে প্রায় কিলোমিটার পথে বহিরাগতদের চলাচল বন্ধ করাসহ সড়কের গলির মুখ বন্ধ করার মাধ্যমে লকডাউন করে দিয়েছে। রবিবার সকাল সাড়ে ১০টারদিকে স্থানীয় এলাকার সাধারন মানুষের মাঝে প্রকাশ পেয়ে যায় গত ৪/৫দিন যাবত ইঞ্জিন চালিত রিকসা চালক মিন্টুর বাসায় নারায়নগঞ্জ থেকে জনৈক মিন্টু নামের এক নিকটতম আত্বিয় আশ্রয় নিয়ে বাসায় অবস্থানসহ এলাকার ভিতর প্রকাশ্য ঘোড়া ফেরা করছে।
কাউনিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ আজিমুল করীমকে বিষয়টি অবহিত করা হলে তিনি তাৎক্ষনিক এস.আই আঃ হালিমকে ঘটনাস্থলে প্রেরন করেন। তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘটনার সত্বতা পায় এবং উক্ত পরিবারের সাথে কথা বলে মিন্টুকে সম্পূর্ণভাবে ঘড়ের ভিতর থাকার জন্য নির্দেশনা দিয়ে আসেন। এছাড়া শনিবার রাতে নগরীর কাটপট্রি সড়কে বাশঁ দিয়ে লকডাউন ঘোষনা করে সড়কে চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হলে তা রবিবার সকালে জন সাধারনের চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এদিকে শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে কতোয়ালী মডেল থানার ওসি)নুরুল ইসলাম নিজেই সারা শহরে সচেতনা আইন মেনে চলার জন্য মাইকিং করে যাচ্ছে।
এদিকে সচেতন নগরবাসীও বরিশাল জেলাকে লকডাউন করার দাবি করেছেন। ইতোমধ্যে বরিশাল মেট্রাপলিটন পুলিশ জরুরিভিত্তিক যানবাহন ছাড়া সব ধরনের যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। আর ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল নিয়ে কেউ বের হলে তার বিরুদ্ধেও নেয়া হচ্ছে ব্যবস্থা। অপরদিকে এলাকাবাসীর উদ্যোগে নগরীর নাজির মহলøা এলাকা লকডাউন করা হয়েছে। যেটাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন প্রশাসনের লোকজনও।
বরিশাল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি পুলক চ্যাটার্জী বলেন, মাদারীপুরে প্রচুর প্রবাসী রয়েছে। যারা আমাদের জেলায় অবাধে প্রবেশ করছে। তাছাড়া মাদারীপুরের শিবপুর আমাদের জেলা থেকে বেশি দূরে নয়। এছাড়াও দুমকিতে নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা এক ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত হযে মারা গেছে। তাছাড়া আমতলীতে আওয়ামী লীগের সভাপতিও করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। তার জানাযায় অনেক লোক হয়েছে এবং তার মরদেহ খোলা অবস্থায় ছিল। আমতলী এলাকা লকডাউন করা হলেও লকডাউন করার আগে লোকজন যদি আমাদের জেলায় এসে থাকে তাহলে সেটা আমাদের জন্য দুশ্চিন্তার। তাই বরিশাল জেলা অনতিবিলম্বে লকডাউন করা উচিৎ। সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন বরিশাল জেলা কমিটির সদস্য সচিব কাজী এনায়েত হোসেন শিবলু দাবি করে বলেন, বরিশাল তো বিভাগের কেন্দ্রস্থল। তাই এখানে আতঙ্কের কারণ বেশি। এর কারণে অতিদ্রæত লকডাউন দরকার। বরিশাল সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি অধ্যাপিকা শাহ সাজেদা বলেন, বরিশালকে অবশ্যই লকডাউন করা দরকার। জনসমাগম করতে যারা দিচ্ছে সেটাও বন্ধ করা দরকার। এদেশের মানুষ না খেয়ে মরবে না। অতএব এই এপ্রিল মাস লকডাউন অবস্থায় যেন বরিশালকে রাখা হয়।
বরিশাল সিভিল সার্জন ডা. মোনায়ার হোসেন বলেন, ‘ইতোমধ্যে জেলায় করোনার কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বা সামাজিক সংক্রমণ পাওয়া যায়নি। আমরা ইতোমধ্যে ৪৬ জনের নমুনা সংগ্রহ করেছি। যার মধ্যে ২৬টিই নেগেটিভ পাওয়া গেছে। বাকি পরীক্ষার ফলাফল পাওয়া যায় না। বরিশালের বাহির থেকে মানুষের আসা যাওয়া ঠেকাতে পারলে এই মহামারি থেকে রক্ষা করতে পারি। এ বিষয়ে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এব্যাপারে বরিশাল জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান বলেন, এক ধরনের লকডাউন চলছে বরিশালে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে যে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে সেটাই আমরা কঠোরভাবে পালন করছি। পাশাপাশি প্রতিদিনই একাধিক ভ্রাম্যমান আদালত অভিযান পরিচালনা করছে। এতে করে সামাজিক দুরত্ব সৃস্টির চেস্টা করা হচ্ছে। বরিশালে প্রবেশের ৬টি স্পট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আমরা সাধ্যমত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ##