• ২১শে জুন, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ , ৭ই আষাঢ়, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বাবুগঞ্জে চালচুরির দায়ে পলাতক ইউপি চেয়ারম্যানকে বাঁচাতে মরিয়া ইউএনও!

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত এপ্রিল ২০, ২০২০, ১৬:৪১ অপরাহ্ণ
বাবুগঞ্জে চালচুরির দায়ে পলাতক ইউপি চেয়ারম্যানকে বাঁচাতে মরিয়া ইউএনও!

নিজস্ব প্রতিবেদক
বাবুগঞ্জ উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়নে ত্রাণের চাল আত্মসাতের অভিযোগে র‌্যাবের দায়েরকৃত মামলায় পলাতক ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য নূরে আলম বেপারীকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন বাবুগঞ্জের উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুজিত হাওলাদার বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। চেয়ারম্যানের বাড়ি থেকে সরকারি ত্রাণে প্রায় ৬ মেট্রিক টন (১৮৪ ব¯Íা) চাল বরিশাল র‌্যাব-৮ সদস্যরা উদ্ধার করলেও সেখানে যাননি ইউএনও। এমনকি র‌্যাবের ওই অভিযানে চাল কম দেওয়ার অভিযোগে কেদারপুর ইউনিয়নের দুই মেম্বার জাকির হোসেন ও রোকনুজ্জামানকে তিনি একমাস করে বিনাশ্রম কারাদÐ দিলেও ইউপি চেয়ারম্যান নূর আলম বেপারীর বিরুদ্ধে তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি।

গত ১৫ এপ্রিল বিকেলে ওই মোবাইল কোর্ট চলাকালে র‌্যাব সদস্যদের উপস্থিতিতেই অভিযুক্ত দুই মেম্বার তাদের স্বীকারোক্তিতে চেয়ারম্যানের বাড়িতে বিপুল পরিমাণ আত্মাসাতকৃত চাল মজুদ আছে মর্মে নিশ্চিত করলেও চেয়ারম্যানের বাড়িতে অভিযান না চালিয়েই ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন ইউএনও। এছাড়াও যাবার সময় র‌্যাবের অপারেশন অফিসারকে নিরুসাহিত এবং ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে চুরির সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়ায় র‌্যাব-৮’র অভিযানিক দল ওই দিনই গভীর রাতে চেয়ারম্যানের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তিনতলা বাড়ির ভেতর থেকে ১৮৪ ব¯Íা সরকারি ত্রাণের চাল উদ্ধার করে।

এ ঘটনায় র‌্যাব-৮’র ডিএডি আবু হোসেন শাহরিয়ার ১৯৭৪ সনের বিশেষ ÿমতা আইনে ইউপি চেয়ারম্যান নূরে আলম বেপারী ও তার চালচুরির সহযোগী ডিলারসহ মোট ৪ জনের বিরুদ্ধে বাবুগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। তবে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো- চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সরকারি প্রায় ৬ মেট্রিক টন চাল আত্মসাতের ঘটনায় র‌্যাবের দায়েরকৃত সেই মামলার কপিসহ কোনো প্রতিবেদন গত ৫ দিনেও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কিংবা জেলা প্রশাসকের দপ্তরে পাঠাননি ইউএনও। অথচ একই সময়ে সেখানে ১০ কেজি করে চাল মাপে কম দেওয়ার অভিযোগে দুই ইউপি সদস্যকে একমাসের কারাদÐ দিয়ে সেই প্রতিবেদন তিনি সেদিনই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেন।

এই তথ্যের সতত্য নিশ্চিত করেছে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ। বরিশালের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক (উপ-সচিব) মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘১০ কেজি করে চাল মাপে কম দেওয়ার অভিযোগে গত ১৫ এপ্রিল বাবুগঞ্জের দুই ইউপি সদস্যকে একমাস করে বিনাশ্রম কারাদÐ দিয়েছেন ইউএনও। আমরা সেদিনই প্রতিবেদন পেয়ে সুপারিশসহ সেটা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি এবং ১৯ এপ্রিল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় অভিযুক্তদের বরখা¯Í করেছে। তবে একই ইউপির চেয়ারম্যানের বাড়ি থেকে র‌্যাবের বিপুল পরিমাণ ত্রাণের চাল উদ্ধার ও মামলার খবর আমরা বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পেরে মামলার কপিসহ ইউএনওকে প্রতিবেদন দিতে বলেছি।’ কিন্তু সোমবার পর্যন্ত তিনি সেটা পাঠাননি বলে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের এই কর্মকর্তা।

গত ১৫ এপ্রিল বাবুগঞ্জ উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়ন পরিষদে এবং চেয়ারম্যানের বাড়িতে অভিযান পরিচালনাকারী বরিশাল র‌্যাব-৮’র স্পেশাল কোম্পানির অপারেশন অফিসার এএসপি মুকুর চাকমা বলেন, ‘জেলেদের বিশেষ খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির ৪০ কেজি চালের পরিবর্তে ৩০ কেজি চাল দেয়া হচ্ছে এবং চেয়ারম্যানের বাড়িতে বিপুল পরিমাণ চোরাই চালের মজুদ আছে মর্মে অভিযোগ পেয়ে কেদারপুরে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসময় ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে চাল কম দেওয়ার ঘটনার সত্যতা পেয়ে হাতেনাতে ২ ইউপি সদস্যকে আটক করা হয় এবং কেদারপুর ইউনিয়নের স্টিমারঘাট এলাকায় ইউপি চেয়ারম্যানের বাড়িতে বিপুল পরিমাণ চালের মজুত দেখতে পেয়ে ইউএনওকে অবহিত করা হয়। পরে ইউএনও ইউনিয়ন পরিষদে এসে মোবাইল কোর্ট করে দুই মেম্বারকে একমাস করে বিনাশ্রম কারাদÐ প্রদান করেন। এসময় চেয়ারম্যানের বাড়িতে থাকা বিপুল চালের মজুদের বিষয়ে ইউএনও’র কাছে সিদ্ধান্ত জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘উপজেলা পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুসারে দীর্ঘদিন ধরেই ওই চাল চেয়ারম্যান তার বাড়িতে রেখে স্থানীয় ৪টি ওয়ার্ডে বিতরণ করছেন। চালের মজুদ সম্পর্কে অবগত আছেন বলে জানিয়ে মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম সমাপ্তি ঘোষণা করে চলে যান ইউএনও।

তবে ত্রাণের চাল বাড়িতে রাখার বিধান কিংবা মজুদকৃত চালের বৈধতার স্বপÿে উপযুক্ত কোনো প্রমাণপত্র কেউ দেখাতে পারেননি। তাছাড়া সাজাপ্রাপ্ত দুই ইউপি সদস্য এবং ত্রাণের কার্ডধারী অনেক ভুক্তভোগী চেয়ারম্যানের বাড়িতে মজুদকৃত ওই চাল আত্মসাৎ করা মর্মে প্রকাশ্য অভিযোগ করেন। পরে ঘটনাস্থল স্টিমারঘাট বাজারে প্রায় ৭ ঘন্টার তদন্তে স্থানীয় ইউপি সদস্যসহ ভুক্তভোগীদের সাÿ্য-প্রমাণে চুরির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরে রাত সাড়ে ১২টার দিকে ওই চাল জব্দ করা হয়। এসময় স্থানীয় ইউপি সদস্য ও সাÿীদের উপস্থিতিতে চেয়ারম্যানের বাড়ির কÿ থেকে আ¯Í ১৮৪ ব¯Íা এবং ভাঙা ব¯Íার ছাড়ানো ছিটানো কিছু চালসহ প্রায় ৬ মেট্রিক টন চাল উদ্ধার করে বাবুগঞ্জ থানায় জমা দেয়া হয়। এসময় ইউপি চেয়ারম্যান নূরে আলম বেপারী, তার ২ ভাই শাহে আলম ও শামসুল আলম এবং চাল বিক্রয় সিন্ডিকেটের হোতা সেন্টু খা’র বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্তে সরকারি ত্রাণের ওই বিপুল চাল আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ১৯৭৪ সনের বিশেষ ÿমতা আইনে বাবুগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়।’

বাবুগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ সভাপতি কাজী ইমদাদুল হক দুলাল বলেন, ত্রাণের চালচুরির বিরুদ্ধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। উপজেলা চেয়ারম্যান ও দলীয় সভাপতি হিসেবে আমার অবস্থানও অভিন্ন। অভিযুক্ত ইউপি চেয়ারম্যানকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন ইউএনও-এমন অভিযোগ আমার কাছেও অনেকে করেছেন। তবে অপরাধী আমার দলের লোক হলেও তার বিরুদ্ধে আমার অবস্থান স্পষ্ট। কিন্তু যেহেতু অভিযুক্ত কেদারপুর ইউপি চেয়ারম্যান নূরে আলম বেপারী উপজেলা কমিটির সদস্য তাই তার বিরুদ্ধে সরাসরি দলীয় শা¯িÍমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের এখতিয়ার আমার নাই। তাকে বহিস্কারসহ তার বিরুদ্ধে শা¯িÍমূলক ব্যবস্থা নিতে পারেন জেলা কমিটি। তাই জেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দকে ঘটনাটি অবহিত করা হয়েছে।

এদিকে ১৮৪ ব¯Íা চাল আত্মসাতের দায়ে পলাতক ইউপি চেয়ারম্যানকে আশ্রয়, প্রশ্রয় ও রÿাচেষ্টার অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুজিত হাওলাদার বলেন, ‘ইউপি চেয়ারম্যানে বিরুদ্ধে মামলা করেছে র‌্যাব। তদন্ত করছে বাবুগঞ্জ থানা পুলিশ। আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। আমি কি ব্যবস্থা নেবো? র‌্যাব দুই মেম্বারকে হাতেনাতে ধরার পরে আমি গিয়ে তাদের সাজা দিয়েছি। আমি সেই প্রতিবেদনই মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি।’ এসময় প্রধানমন্ত্রী চালচোরের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স অবস্থানের কথা বলা হলে ইউএনও বলেন, এটা প্রধানমন্ত্রীর বিষয় না। তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে বলে কৌশলে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে পদÿেপ গ্রহণে নিজের দায়ভার এড়িয়ে যান ইউএনও।

বাবুগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, কেদারপুর ইউপি চেয়ারম্যানের বাড়ি থেকে ১৮৪ ব¯Íা ত্রাণের সরকারি চাল উদ্ধার এবং বাদী হয়ে বাবুগঞ্জ থানায় মামলা করেছে র‌্যাব। পলাতক আসামীদের গ্রেফতার এবং মামলার তদন্ত করে আদালতে চার্জশিট প্রদান করবে পুলিশ। স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের যাবতীয় দায়ভার ইউএনও এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের। এই দায়দায়িত্ব পুলিশের নয়।

এদিকে কার্ডধারী ভুক্তভোগীসহ স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের অভিযোগ, ভিজিডি, জেলে কার্ড, ১০ টাকার খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল একত্রে দুই কি¯িÍ উত্তোলন করে এক কি¯িÍর চাল ইউএনও’র যোগসাজসে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গোডাউনে বসেই বিক্রি করে দিতেন ইউপি চেয়ারম্যান নূরে আলম বেপারী। অর্ধেক চাল নিয়ে গেলেও ইউনিয়ন পরিষদে কিছু চাল রেখে ইউএনও’র মৌখিক নির্দেশে বাকি চাল নিয়ে তিনি নিজের বাড়িতে রাখতেন। সেই চালও তিনি ভুয়া কার্ডের মাধ্যমে এক তৃতীয়াংশ সরাসরি আত্মসাৎ করতেন। অবশিষ্ট চালের কার্ডধারীদেরও মাপে কম দিয়ে সেখান থেকে উদ্বৃত্ত থাকা চাল মেম্বারদের সাথে ভাগাভাগি করতেন। এছাড়াও ড্রেজার মেশিন ও নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনে রমরমা ব্যবসা ইউএনও’র সহায়তায় দীর্ঘদিন নির্বিঘেœ চালিয়ে আসছিলেন ইউপি চেয়ারম্যান নূরে আলম বেপারী।

সরকারি চর কেটে অবৈধভাবে ইটভাটা নির্মাণ এবং বাবুগঞ্জ উপজেলার সুগন্ধা, সন্ধ্যা ও আড়িয়াল খাঁ নদী থেকে বছরের পর বছর কোটি কোটি ঘনফুট বালু উত্তোলন করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করে আসছিলেন তিনি। এতে মারাত্মক নদী ভাঙনের শিকার হয় বাবুগঞ্জ উপজেলার কেদারপুর, আগরপুর ও রহমতপুর ইউনিয়ন। গৃহহীন হয়ে পড়ে হাজার হাজার পরিবার। শেষে ভাঙনমুখে থাকা বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের পÿ থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে হাইকোর্টে একটি রিট করা হলেও বালুখেকো কেদারপুর ইউপি চেয়ারম্যানকে থামানো যায়নি। স্টিমারঘাটে বাজারে তার তিনতলা ভবনটিও সরকারি খাস জমি দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় ৪ নং ওয়ার্ডের মেম্বার ইদ্রিস কবিরাজ। তার সকল অপকর্মের দোসর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সরদার খালেদ হোসেন স্বপন এবং ইউএনও সুজিত হাওলাদার বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের শেল্টারেই অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটে বেপরোয়া হয়ে গিয়ে অপরাধের সা¤্রাজ্য গড়ে তোলেন কেদারপুর ইউপি চেয়ারম্যান নূরে আলম বেপারী। #