• ২৩শে জুন, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ , ৯ই আষাঢ়, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বরিশালে জেগে উঠছে মাদকের নতুন চক্র ; করোনাতেও থেমে নেই কার্যক্রম

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত এপ্রিল ২১, ২০২০, ১৫:১৩ অপরাহ্ণ
বরিশালে জেগে উঠছে মাদকের নতুন চক্র ; করোনাতেও থেমে নেই কার্যক্রম

শফিক মুন্সি :: বরিশাল নগরীতে লাভজনক মাদক বিক্রিতে গড়ে উঠছে নতুন চক্র। সরকারি ও প্রশাসনিক তৎপরতায় পুরনো চক্রগুলো বিপাকে পড়েছে বছর খানেক ধরে। এই সময়ে তাই নতুন মাদকদ্রব্যের আমদানি এবং বিক্রির পদ্ধতি পরিবর্তন করে চলমান রাখা হচ্ছে ব্যবসা। যা থেমে নেই বর্তমান মহামারী করোনা সংকটেও। তবে নগরীকে সম্পূর্ণ মাদক মুক্ত রাখার ঘোষনাই পুলিশের পক্ষ থেকে এসেছে নতুন করে। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বরিশাল অফিসকেও ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া চলছে। তবে মাদক ব্যবসার ধরণ পরিবর্তন হয়ে গেছে অনেকটাই। তাই প্রশাসনের এমন পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত নগরীর সুধী সমাজ। এক সময় জনপ্রিয় ও সহজলভ্য মাদকদ্রব্য ছিল ইয়াবা। কিন্তু নগর পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানে কোটি কোটি টাকার ইয়াবা চালান সহ বিক্রেতাদের আটক করা হয়। এতে কিছুটা রণে ভঙ্গ দেয় নগরীর ইয়াবা ব্যবসায়ীরা৷ বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ (বিএমপি) কমিশনার শাহাবুদ্দিন খান এসব অভিযান পরিচালনা করে বেশ প্রশংসা অর্জন করেন। কিন্তু সম্প্রতি দেখা গেছে ইয়াবা থেকে ফেনসিডিলে ঝুঁকে পড়ছে এখানকার মাদকসেবীরা। আশ্চর্যজনক ভাবে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছে তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ। যাদেরকে মাদক বিক্রেতা হিসেবে সহজে সন্দেহ করা যায় না। এমনকি ফেনসিডিলের চালান নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বেনাপোলে ধরা পড়েন বরিশালের নামকরা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। তারপর থেকেই বেড়িয়ে আসতে থাকে নগরীর মাদক ব্যবসার নতুন চালচিত্র। সর্বশেষ গত সোমবার রাতে ৫২০ বোতল ফেনসিডিলের চালান জব্দ করে বরিশাল বানারীপাড়া থানা পুলিশ।এই ঘটনায় আটককৃত দুই মাদক কারবারি হলো যশোরের বেনাপোল থানার বুত্তিপাশা গ্রামের মনিরুজ্জামান (২৮) ও যশোর কোতয়ালী থানার দত্তপাড়া গ্রামের ছেলে মেহেদী হাসান (২৬)। তারা এই চালান বরিশাল নগরীতে পৌঁছে দেবার জন্য বেনাপোল থেকে নিয়ে আসছিলো। নজরুল ইসলাম(৪৪) নামে বরিশালের সেই শিক্ষকটি বেনাপোলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে সোপর্দ হবার পর বেরিয়ে আসে তাঁর চক্রের হাল হকিকত। গত সোমবার (২০ এপ্রিল) দুপুরে বেনাপোল পোর্ট থানার শিকড়ী বটতলা থেকে তাকে আটক করে বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) সদস্যরা। এসময় তার কাছ থেকে ৮২ বোতল ফেনসিডিল পাওয়া যায় বলে নিশ্চিত করেছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। গণমাধ্যমের সূত্রে জানা যায়, নজরুলের সঙ্গে ছিল আইনজীবি আলম রশীদ লিখন (৪২), সদর হাসপাতাল চিকিৎসক ডা. মিঠু (৩৫), উত্তরা ব্যাংক কর্মকর্তা ডোনা (৩৫), ব্যবসায়ী হেলাল উদ্দিন বুলেট (৩৮) ও মনির হোসেন (৪০)। তারা নিয়মিত বেনাপোলে এসে ফেনসিডিল নিয়ে যেত বরিশালে। ঐদিন নজরুল আটক হলেও বাকিরা বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে মাদকের চালানসহ পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। নজরুল আরো জানায়, প্রতি বোতল ফেনসিডিল বেনাপোল থেকে বরিশাল এনে বিক্রি করলেই লাভ হতো ৫০০ টাকা। দুই মাস পরপর চারশো থেকে আটশো বোতল ফেনসিডিল বরিশালে নিয়ে আসতেন শিক্ষক নজরুল ও তাঁর সহযোগীরা। এতে এই চক্রের মাসিক মুনাফা হতো দুই থেকে চার লক্ষ টাকা। এছাড়া নিজেদের মাদক সেবনের তুষ্টি তো থাকতোই। এর আগে গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বরিশাল অফিসে অবৈধভাবে মদ বিক্রি করার ঘটনা ঘটে৷ বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে পরদিনই সেখানকার ২৫ জন কর্মকর্তা একযোগে বদলি হন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা গেছে অবৈধভাবে মাদক বিক্রি করে রাতারাতি বড়লোক হয়েছেন সেখানকার কিছু কর্মকর্তা। মাদক ব্যবসার সঙ্গে সমাজের উঁচু শ্রেণীর এসব মানুষের জড়িত হবার খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নগরীর সূধী সমাজ। বরিশাল ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ স ম ইমানুল হাকিম বলেন, ” ঘটনা গুলো যদি সত্যি হয় তবে এটা অত্যন্ত উদ্বেগ ও পরিতাপের বিষয়। যারা মাদকের ভয়াবহতা তুলে ধরবে তারাই যদি এমন ঘৃণিত ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকে তবে সমাজ অন্ধকারে ধাবিত হয়”। যেহেতু উচ্চ শ্রেণীর লোকজন মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে গেছে। তাই তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে প্রশাসন কতটুকু সক্ষম হবে সে ব্যাপারেও সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি। মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত এসব চক্রকে হুঁশিয়ারি প্রদান করেন বিএমপি কমিশনার শাহাবুদ্দিন খান। তিনি বলেন, ” সমাজের অন্যতম দন্ডনীয় ও ঘৃণিত কাজ মাদক ব্যবসা।এর সঙ্গে জড়িতরা সমাজের যে শ্রেণীরই হোক না কেন তাদের ব্যাপারে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতিতে আছি আমরা। জড়িত যেই হোক তাকে আইনের আওতায় আনা হবে “। বিগত দিনে মাদকের বিরুদ্ধে সফল অভিযানের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, বরিশালে মাদকের সঙ্গে জড়িত বেশিরভাগ লোকেরা অভিযানের কারণে কোণঠাসা। সেসব অভিযানের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হবে৷