বাবুগঞ্জ (বরিশাল) প্রতিনিধি
বাবুগঞ্জে ঢাকা থেকে আসা শ্রমিক যুবকদের হোম কোয়ারেন্টাইন করার নামে টাকা দাবি করার অভিযোগে তাদের মায়ের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন এক গ্রামপুলিশ সদস্য। এ ঘটনায় বিচারের নামে পরদিন স্থানীয় দুই ইউপি সদস্যসহ অর্ধশতাধিক লোকজনের উপস্থিতিতে ওই বাড়িতে হামলা চালিয়ে মহিলাসহ ৪ জনকে মারপিট করেছেন গ্রামপুলিশের স্বজনরা। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে থানায় উল্টো একটি জিডিও করেছেন দেহেরগতি ইউনিয়নের অভিযুক্ত গ্রামপুলিশ সদস্য আলী হোসেন।
প্রত্যক্ষদর্শী, ভুক্তভোগী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বাবুগঞ্জ উপজেলার দেহেরগতি গ্রামের কুদ্দুস ফরাজির দুই ছেলে ও শ্যালক ঢাকায় নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করতেন। করোনার প্রভাবে নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় কয়েকদিন আগে তারা গ্রামের বাড়িতে চলে আসেন। এদিকে ঢাকা থেকে আসার খবর পেয়ে তাদের ৩ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইন করতে যান স্থানীয় গ্রামপুলিশ সদস্য (চৌকিদার) আলী হোসেন।
কুদ্দুস ফরাজির স্ত্রী ফাতেমা বেগম অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার দুই ছেলে ও ভাই ঢাকা থেকে আসার খবর পেয়ে শুক্রবার বাড়িতে আসেন চৌকিদার আলী হোসেন। তিনি এসে প্রথমে কিছু উপদেশ দিয়ে পরক্ষণেই বলেন তাকে কিছু টাকা দিতে। তাহলে আর লকডাউন বা ঝামেলা হবে না। ওরা বাড়িতেই থাকতে পারবে। এরপরে আমি ওদের না খেতে পেয়ে ধারদেনা করে ঢাকা থেকে বহুকষ্টে চলে আসার কাহিনী বলতে গেলে চৌকিদার উল্টো ক্ষেপে গিয়ে আমাকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি শুরু করেন। সহ্য করতে না পেরে এক পর্যায়ে আমি তাকে আঙ্গুল তুলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বললে তিনি আমার আঙ্গুল মোচড় দিয়ে ভেঙে ফেলতে যান। এসময় আমি আত্মরক্ষার্থে চৌকিদারকে একটা থাপ্পড় মারি। তিনিও সঙ্গেসঙ্গে আমাকে ৪-৫টা চড়-থাপ্পড় দেন। পরে আমাদের দেখিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করতে করতে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান এবং পরদিন স্থানীয় দুই মেম্বারসহ অর্ধশতাধিক লোকজন নিয়ে তিনি আমাদের বাড়িতে হামলা চালান। এসময় আমাকে এবং আমার দুই ছেলে রবিউল, রিয়াজুল ও আমার ছোটভাই শাহাদাতকে ঘর থেকে টেনে নামিয়ে চৌকিদার আলী হোসেনের নেতৃত্বে তার চাচাতো ভাই সেলিম, খলিল, হাবিলসহ ৬-৭ জন বেদম মারপিট করেন। যাবার সময় বাড়ির সামনে খালের ওপর আমাদের চলাচলের সাঁকো ভেঙে দিয়ে যান।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেশি মনির হোসেন বলেন, ‘ঘটনার পরদিন শনিবার কুদ্দুস ফরাজির বাড়িতে স্থানীয় পুরুষ ও মহিলা মেম্বারসহ ৫০ জনেরও বেশি লোকজন দেখে এগিয়ে যাই। এসময় শুনি তারা নাকি আগেরদিন শুক্রবার চৌকিদারকে থাপ্পড় মারার বিচার করতে এসেছেন। তখন কুদ্দুসের স্ত্রী ফাতেমাকে গালাগালির একপর্যায়ে তার দুই ছেলে ও শ্যালককে মারপিট করেন চৌকিদার আলী হোসেনের আত্মীয় কিছু ছেলেপেলে। তবে শুক্রবারের ঘটনার সময় আমি উপস্থিত ছিলাম না। সেটা ফাতেমা বেগম আর চৌকিদারই ভালো বলতে পারবেন।’
এ ঘটনার সত্যতা জানতে দেহেরগতি ইউপির ১নং ওয়ার্ড সদস্য বাবুল হাওলাদার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, শুক্রবার চৌকিদারকে থাপ্পড় মারার ঘটনা নিয়ে মীমাংসার জন্য আমি শনিবারে ফাতেমাদের বাড়িতে যাই। তবে আমি ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই কিছু ছেলেপান গিয়ে হালকা মারপিট করেছে বলে শুনেছি। এসময় ফাতেমাদের বাড়ির সামনে থাকা চারের (সাঁকো) হাতল ভেঙে ফেলেছিল তারা। তবে পরে চেয়ারম্যানের নির্দেশে পুরা ঘটনারই মীমাংসা করে দেওয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে দেহেরগতি ইউপি চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মুঠোফোনে বলেন, হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলায় নাকি আমার ১নং ওয়ার্ডের চৌকিদারকে থাপ্পড় মেরেছিলেন ফাতেমা বেগম। এ ঘটনায় চৌকিদার আলী হোসেনের কয়েকজন আত্মীয়-স্বজন গিয়ে পরদিন তাদের মেরেছে বলে শুনেছি। তবে টাকা চাওয়ার বিষয়টি আমার জানা নাই। মারামারির খবর পাওয়ার পরে দুই মেম্বারকে পাঠিয়ে বিরোধের মীমাংসা করে দিয়েছি। কিন্তু উপরস্থ চাপ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে চৌকিদার আলী হোসেন থানায় একটি জিডি করেছেন।
বাবুগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মিজানুর রহমান বলেন, গ্রামপুলিশ সদস্য আলী হোসেন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলায় তাকে মারপিট করার অভিযোগে দেহেরগতি গ্রামের ফাতেমা বেগম, তার স্বামী কুদ্দুস ফরাজি, ছেলে রবিউল ইসলাম এবং ফাতেমার ভাই শাহাদাত হোসেনের নামে একটি জিডি করেছেন আলী হোসেন। জিডির তদন্ত চলছে। তদন্তে সত্যতা পেলে আসামীদের বিরুদ্ধে নন-এফআইআর প্রসিকিউশন দেয়া হতে পারে।’
এদিকে হোম কোয়ারেন্টাইনের নামে চাঁদাদাবির অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে দেহেরগতি ১নং ওয়ার্ডের গ্রামপুলিশ সদস্য আলী হোসেন বলেন, ‘লকডাউনের মধ্যে ফাতেমার বেগমের দুই ছেলে ও ছোটভাই ঢাকা থেকে এসে বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। আমি তাদের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলায় ক্ষিপ্ত হয়ে আমাকে মারপিট করেছেন তারা। তবে সেজন্য আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে দ্বিতীয় দফায় তাদের বাড়িতে গিয়ে কেন মারলেন এবং মেরে পরে আবার থানায় জিডি কেন করলেন? -এমন প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। #