নিজস্ব প্রতিবেদক
বরিশালে হতদরিদ্রের ভুয়া তালিকা তৈরি করে শুধুমাত্র একটি ওয়ার্ডের বরাদ্ধের ২০ টন চাল আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কেবলমাত্র কাগজ-কলমে হতদরিদ্রের নাম তুলে চেয়ারম্যান, মেম্বার, ট্যাগ অফিসার এবং ডিলার মিলে ওই চাল কালোবাজারে বিক্রি করে দিয়েছেন।
৭০৫ জন হতদরিদ্র নারী-পুরুষের নামের তালিকা কাগজে থাকলেও বাস্তবে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত বিনামূল্যের ওই চাল পেয়েছেন ৪শ’ থেকে ৫শ’ জন।
খাদ্য অধিদপ্তরে দাখিল করা বরিশাল সদর উপজেলার সায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের ১নং দক্ষিণ আইচা ওয়ার্ডের তালিকা পর্যালোচনা এবং সরেজমিনে ঘুরে বিভিন্ন নারী-পুরুষের সাথে কথা বলে এই তথ্য পাওয়া গেছে। ঠিক একই অবস্থা ওই ইউনিয়নের বাকী ৮টি ওয়ার্ডের।
এদিকে, চেয়ারম্যান-মেম্বারের চাল আত্মসাতের এই ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে এবং নিজেকে দুর্নীতির হাত থেকে রক্ষা পেতে ইতিমধ্যে ডিলারশীপ বাতিল করেছেন এক ব্যক্তি।
হতদরিদ্রদের বিপুল পরিমান এই চাল আত্মসাতের সাথে জড়িতরা হলেন- সায়েস্তাবাদ ইউপি চেয়ারম্যান আরিফুজ্জামান মুন্না, ১নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য কবির হোসেন তালুকদার, ডিলার পিন্টু এবং তদারকি (ট্যাগ) অফিসার স্থানীয় চর আইচা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জামাল হোসেন।
তবে, অভিযুক্তরা নিজেদেরকে নির্দোষ দাবি করে একে অপরের উপর দায় চাপানোর চেষ্টা করেন গণমাধ্যমের কাছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সায়েস্তাবাদ ইউনিয়নে আরিফুজ্জামান মুন্না চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবার পর থেকে কাগজে-কলমে বিভিন্ন ভূয়া প্রকল্প দাখিল করে সরকারি অর্থ আত্মসাত এবং ভিজিডি-ভিজিএফ সহ বিভিন্ন তালিকায় অনিয়ম করে আসছে। সরকার সমর্থিত চেয়ারম্যান হওয়ায় সরকারি দপ্তরে যেমন তার ভূয়া প্রকল্পের অর্থ উত্তোলনে আপত্তি ছিলোনা, ঠিক তেমনি স্থানীয় সাধারণ জনগনও তার অনিয়ম এবং চাল আত্মসাতের বিরুদ্ধে কেউ টু-শব্দ পর্যন্ত করার সাহস দেখাননি।
সম্প্রতি হতদরিদ্রের চাল বিতরনে এক ডিলার তার ডিলারশীপ বাতিল করে চলে যাওয়ায় চেয়ারম্যান মুন্না’র অনিয়ম এবং দুর্নীতি ফাঁস হয়ে যায়।
ওই তথ্যের আলোকে গণমাধ্যমকর্মীরা কেবলমাত্র ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের হতদরিদ্রের তালিকা সংগ্রহ করে। বরিশাল সদর উপজেলা খাদ্য দপ্তরে দাখিল করা চেয়ারম্যান আরিফুজ্জামান মুন্না এবং ১নং ওয়ার্ড সদস্য কবির হোসেন স্বাক্ষরিত তালিকা নিয়ে সরেজমিনে গিয়ে পাওয়া যায় চাঞ্চল্যকর একাধীক তথ্য।
১নং ওয়ার্ডের ওই তালিকায় স্থান পেয়েছে মৃত ব্যক্তিদের নাম, একই ব্যক্তির একাধীকবার নাম, স্বামী-স্ত্রী, পিতা-পুত্রের নাম, ওই ওয়ার্ডের বাসিন্দা নন এমন ব্যক্তিদের নাম। আবার তালিকায় স্থান পেয়েছে কিন্তু তারা আদৌও চাল-কার্ড তো পানইনি; হতদরিদ্রের তালিকায় তাদের নামের খবরটি পর্যন্তও তারা জানেন না। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রতিটি হতদরিদ্র পরিবারের একজন সদস্য বছরে ১৫০ কেজি চাল পাবেন। ৫ মাসে ৩০ কেজি করে এই চাল বিতরন করে আসছে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে। সায়েস্তাবাদ ইউনিয়নে ইতিমধ্যে ৩০ কেজি করে দুই কিস্তিতে ৬০ কেজি চাল বরাদ্ধ এবং বিতরন করা হয়েছে।
জানা গেছে, সরকার নির্দেশিত হতদরিদ্র প্রতি পরিবারের একজন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলে ১নং ওয়ার্ডের মোট খানা (বসতঘর) ৫৯০টি। প্রতিটি পরিবার হতদরিদ্র হলে সেখানকার তালিকায় ৫৯০ জন অন্তর্ভুক্ত হবেন। কিন্তু ইউপি চেয়ারম্যান মুন্না এবং ১নং ওয়ার্ড মেম্বার কবির হোসেন চাল আত্মসাতের জন্য এই ওয়ার্ডের তালিকায় ৭০৫জন নারী-পুরুষকে অন্তর্ভুক্ত দেখিয়েছেন।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইউনিয়নের ১নং দক্ষিণ আইচা ওয়ার্ডের হতদরিদ্রের তালিকায় দেখা যায় ৭ নম্বর ক্রমিকের হাসমত আলী ঘরামীর ছেলে মন্নান ঘরামীর নাম একই তালিকায় ৪৩৭ নম্বারে। ৫৭ নম্বরের মো. আব্দুল মজিদ মিয়ার ছেলে কাঞ্চন মিয়ার নাম দ্বিতীয়বার ১৫৮ নম্বারে। একইভাবে ৭১, ১২৮ ও ৪৯৪ নম্বরে রয়েছে মমিনের ছেলে নজরুল ইসলামের নাম। ৭৬ ও ৯২ নম্বরে হালিম ফকিরের ছেলে মো. আনিচুর রহমান, ৯৭ ও ২৬৯ নম্বরে মৃত: কাজেম আলী তালুকদারের ছেলে বজলুর রহমান মুকুল, ১৩৩ ও ২৯৮ নম্বরে আদম আলীর ছেলে মঞ্জু, ১৩৭ ও ৩৯২ নম্বরে আব্দুল আজিজ হাওলাদারের ছেলে মো. মিজান হাওলাদার, ১৪১ ও ৫১৪ নম্বরে আক্কাস আলীর ছেলে স্বপন, ১৬০ ও ১৮৮ নম্বরে আব্দুল মজিদ হাওলাদারের স্ত্রী ফিরোজা বেগম, ১৮৭ ও ৪৩১ কালু মুন্সির ছেলে মো. সামসুল হক, ১৯৫ ও ৬৬০ মফিজুর রহমানের স্ত্রী মোকছেদা, ২০৮ ও ৪৫৮ নম্বরে আমির হোসেন মাঝির স্ত্রী তাসছলিমা বেগম, ৩৪২ ও ৪০৩ নম্বরে হাসেম রাড়ীর ছেলে মো. স্বপন রাড়ী, ৩৫৮ ও ৬৪৭ নম্বরে রহমান ফকিরের ছেলে শামীম, ৩৭১ ও ৫৮৭ নম্বরে সাথানাথ বেপারীর ছেলে দিলিপ কুমার বেপারী, ৩৮১ ও ৫৭৮ নম্বরে জবেদ রাড়ীর ছেলে আলমগীর রাড়ী, ৩৯৮ ও ৪০৮ নম্বরে মো. খলিল বয়াতীর ছেলে রবিউল, ৪৮৩ ও ৬৯৭ নম্বরে জব্বার খনসমার ছেলে খলিলুর রহমান, ৫২৯ ও ৬৭৯ নম্বরে আব্দুল খালেক হাওলাদারের স্ত্রী নিরু বেগম, ৬৪০ ও ৬৮৬ নম্বরে উত্তম কুমার হালদারের ছেলে অপূর্ব হালদার, ৬৭২ ও ৬০৩ নম্বরে রুস্তম আলী সিকদারের স্ত্রী মোকছেদা বেগম এবং ৬৮১ ও ৫২৭ নম্বরের হাসমত আলীর ছেলে বাদশার নাম তালিকায় একাধীকবার স্থান পেয়েছে।
একইভাবে তালিকায় স্থান পেয়েছে মৃত দুইজনের নাম। ১৯ নম্বরের ঘর চরন দুয়ারীর ছেলে নিরঞ্জন দুয়ারী এবং ৩৭৬ নম্বরের জবেদ আলী রাড়ীর ছেলে ইউনুস রাড়ী।
হতদরিদ্রের তালিকা প্রণয়নে সরকারি নিয়মকে সম্পূর্ণ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একই ঘরে স্বামী ও স্ত্রী দুজনের নাম অন্তভুক্ত করেছেন চেয়ারম্যান মুন্না ও মেম্বর কবির তালুকদার।
তালিকায় দেখা যায়- ১ নম্বরের মোসা: পরভীনের স্বামী মৃত: খালেক বয়াতীর নাম রয়েছে ২১৭ নম্বর তালিকায়। ১১০ স্ত্রী ফিরোজা, ১২৪ স্বামী আক্কেল খান ও ৬৮৭ নম্বরে দ্বিতীয়বার স্ত্রী ফিরোজার নাম তালিকায় স্থান পেয়েছে। ৪২ ও ১০৬ নম্বরে রয়েছে স্ত্রী মিনা রানী মন্ডল ও স্বামী সুশান্তের নাম। তালিকার ৮ নম্বরের মো. রাজা আলীর স্ত্রী লাইজুর নাম রয়েছে ৬৮২ নম্বরে। ১৬ নম্বরের হাওয়া বেগমের স্বামী আব্দুল মুন্সীর নাম রয়েছে ৪৪৬ নম্বরে। ৪৯৮ নম্বরে স্ত্রী ফরিদা বেগম এবং ৬০৮ নম্বরে স্বামী সিরাজ সিকদারের নাম। ৩১ নম্বরে স্বামী দুলাল বয়াতী ও ২৬৮ নম্বরে স্ত্রী হিরু বেগম, ৪০৪ নম্বরে স্ত্রী মনজু বেগম এবং ৪৩৬ নম্বরে স্বামী মো. বাচ্চু মীরের নাম।
তালিকা পর্যালোচনা দেখা যায়, তালিকায় স্বামী ও স্ত্রীদের যেভাবে স্থান দেওয়া হয়েছে, ঠিক একইভাবে একাধীক পিতা ও পুত্রদের অর্ন্তভুক্ত করেছেন তালিকা প্রণয়নকারী চেয়ারম্যান-মেম্বার। ৪৩, ৪৪ ও ৫৯০, ৬৫ ও ৭৯, ১৮৩ ও ২৪৯, ১৬৪ ও ২৫৯, ৯৪ ও ২৬১, ২২৬ ও ২৭১, ১০০ ও ৩৪৭, ৩৬৮, ৩৭৩, ৬৪০ ও ৬৮৬, ৫৬২ ও ৫৮২ নম্বরের তালিকায় রয়েছে পিতা ও পুত্র।
১নং আইচা ওয়ার্ডের বাসিন্দা নন; এধরনের একাধীক ব্যক্তিকে হতদরিদ্রের তালিকায় অর্ন্তভুক্ত করার ঘটনাও ঘটেছে। তালিকার ৯২, ১২৫, ২১০, ৪৪১, ৫০১, ৫৩০, ৫৩১, ৫৭০, ৫৯২, ৫৯৭, ৫৯৮, ৫৯৯, ৬১৭ নম্বরের ব্যক্তিরা আইচা ওয়ার্ডের বাসিন্দা নন। কিন্তু তাদের নাম তালিকায় অর্ন্তভুক্ত করে বিগত দুই কিস্তিতে প্রত্যেক নামের বিপরীতে ৬০ কেজি করে চাল আত্মসাত করেছে চেয়ারম্যান-মেম্বার সহ সংশ্লিষ্টরা। এদিকে তালিকায় স্থান পেলেও আজ পর্যন্ত চাল এবং খাদ্য অধিদপ্তর থেকে দেওয়া কার্ড হাতে পাননি বহু ব্যক্তি।
সরেজমিনে তালিকা নিয়ে ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ১নং ওয়ার্ডের হতদরিদ্রের তালিকায় অর্ন্তভুক্ত হওয়া তালিকার ৯৫ নম্বরের মাকসুদা বেগম, ২৮২ নম্বরের মো. আলমগীর মোল্লা, ৪৮৯ নম্বরের মাহমুদা বেগম, ৪৯১ নম্বরের আলম হাওলাদার, ৪১৫ নম্বরের আলেয়া, ২৭৩ নম্বরের সুমাইয়া আক্তার, ৬৯২ নম্বরের জহুরা বেগম, ৬৫০ নম্বরের মানসুরা, ৩৯৩ নম্বরের হনুফা বেগম, ৩৮৬ নম্বরের মজিদ বেপারী, ২০৬ নম্বরের আব্দুর রশিদ হাওলাদার, ৫১৫ নম্বরের স্বপন শীল সহ একাধীক ব্যক্তি আদৌ যানেনা তাদের নামে বিগত দুইবার ৩০ কেজি করে ৬০ কেজি চাল এসেছে।
এবিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক ডিলার মিরাজ হোসেন বলেন, ১নং ওয়ার্ডের হতদরিদ্রের তালিকায় যাদের নাম আছে তার বেশীরভাগ ভূয়া। প্রথম কিস্তির চাল বিতরন করতে গিয়ে জানতে পারি তালিকার বেশিরভাগ লোকের নাম একাধীকবার, অন্য এলাকার বাসিন্দা, মৃত ব্যক্তিদের নাম। তালিকার ভূয়া ওই নামের চাল চেয়ারম্যান মুন্নার নির্দেশে মেম্বার কবির তালুকদার গোডাউনে বিক্রি করে দিয়েছে। নিজেকে অনিয়ম-দুর্নীতি থেকে রক্ষা পেতে ডিলারশীপ বাতিল করে দিয়েছি বলে জানান মিরাজ।
বর্তমান ডিলার পিন্টু জানান, আমি কিছুই জানিনা। চেয়ারম্যান-মেম্বার যেভাবে বলেছে সেভাবেই চাল দিয়েছি। কতজনকে চাল দিয়েছেন জানতে চাইলে পিন্টু এড়িয়ে গিয়ে বলেন, তদারকি (ট্যাগ) অফিসারের উপস্থিতিতে চাল বিতরন করা হয়।
ট্যাগ অফিসার স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জামাল হোসেন জানান, চেয়ারম্যান-মেম্বারদের তৈরি করা তালিকা অনুযায়ী চাল বিতরন করা হয়। তিনিও কতজনকে চাল বিতরন করা হচ্ছে জানতে চাইলে সকল কিছু চেয়ারম্যান-মেম্বার জানেন বলে এড়িয়ে যান।
১নং ওয়ার্ডের মেম্বার কবির তালুকদার জানান, ভাই রাজনীতি করি। দু-একটু এদিক-সেদিক না করলে লোকজনকে সামনের দিনে কি পাওয়া যাবে ? তালিকায় অনিয়ম প্রসঙ্গে বলেন, নতুন করে আবার তালিকা করা হবে।
সায়েস্তাবাদ ইউপি চেয়ারম্যান আরিফুজ্জামান মুন্না’র নিকট জানতে চাইলে উত্তেজিত কন্ঠে জানতে চান আপনাকে তালিকা কে দিয়েছে ? তালিকায় কাদেরকে নাম থাকবে, না থাকবে তাতে আপনাদের কি ? মৃত ব্যক্তি, অন্য এলাকার বাসিন্দা, একই পরিবারে একাধীক কার্ড এবং তালিকাভুক্ত অনেকে চাল পাচ্ছেনা এ প্রসঙ্গে চেয়ারম্যান মুন্না বলেন, চাল তো আমি বা মেম্বার দেয়না। তালিকায় অনিয়ম থাকলে নতুনভাবে করা হবে। বিগতদিনের চাল কি করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সে ব্যাপারে আমার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আছে; তারাই দেখবেন।
বরিশাল জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রন কর্মকর্তা মো. তাজুল ইসলাম জানান, হতদরিদ্রের তালিকায় একই পরিবারের একাধীক নাম ও বহিরাগত ব্যক্তিদের থাকার সুযোগ নেই। সায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের তালিকায় অনিয়মের বিষয়টি আমার জানা নেই। খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান জেলা খাদ্য দপ্তরের শীর্ষ এই কর্মকর্তা।