• ২১শে জুন, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ , ৭ই আষাঢ়, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সরকারি স্কুলের শিক্ষক সংকট চরমে : নিয়োগ অনিশ্চয়তায় ৫ হাজার নিয়োগ প্রার্থী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত ডিসেম্বর ২১, ২০২০, ০৭:৩৮ পূর্বাহ্ণ
সরকারি স্কুলের শিক্ষক সংকট চরমে : নিয়োগ অনিশ্চয়তায় ৫ হাজার নিয়োগ প্রার্থী

সাইদুর রহমান পান্থ, বরিশাল ব্যুরো
চরম শিক্ষক সংকটে ভুগছে দেশের সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো। বিশেষ করে বরিশালের গ্রাম ও মফস্বল অঞ্চলের স্কুলের চিত্র আরো ভয়াবহ। এ সংকট নিরষনে সরকার এই সব স্কুলে শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ গ্রহন করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালে শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষায় সাত সহস্রাধিক শিক্ষক প্রার্থী উত্তীর্ণ হয়। সর্বশেষ তাদের মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণে করা হয়েছে। তবে নিয়োগ দেয়া হবে মাত্র ১৯৯৯ জন। যার কারণে ৫ হাজারেরও বেশি শিক্ষক প্রার্থী নিয়োগ পাওয়া নিয়ে অনিশ্চিয়তায় পড়েছে। তবে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর বলছে নতুন করে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি করে পর্যায়ক্রমে শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে সংকট দুর করা হবে। এদিকে বরিশালের ২২টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মাত্র ৪টিতে স্থানীয় প্রধান শিক্ষক রয়েছে। বাকিগুলো ভারপ্রাপ্ত দিয়ে চলছে। নিয়োগ প্রার্থীরা দাবী করেছেন, ২০১৮ সালের সার্কুলারেই আমারা নিয়োগ পাচ্ছি। আবার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও নিয়োগ কার্যাক্রম শেষ করতে করতে আমাদের চাকুরীর বয়স আর থাকবে না। এই নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন এ নিয়োগ প্রার্থীরা।
জানা গেছে, ২০১৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। ২০১৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর এ নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় এবং ২০ নভেম্বর লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) জানিয়েছে, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সর্বশেষ শিক্ষক নিয়োগ হয়েছিল ২০১১ সালে। এরপর থেকে বিসিএসের নন-ক্যাডার থেকে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হচ্ছিল। তবে বিসিএস নন-ক্যাডার থেকে স্কুলগুলোর জন্য বিষয়ভিত্তিক পর্যাপ্ত শিক্ষক পাওয়া যাচ্ছিল না। তাছাড়া, বিসিএসের নন-ক্যাডার থেকে যারা শিক্ষক পদে নিয়োগ পেয়ে আসেন, তাদের বেশিরভাগই পরে অন্য চাকরিতে চলে যান। এতে বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট থেকেই যায়।
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগের প্রার্থীরা জানান, তারা ৭ হাজার ১৬১ জন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও অনেকেই বিভিন্ন পদে এরই মধ্যে চাকরি পেয়ে গেছেন। কেউ কেউ ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি জুলাই পর্যন্ত পিএসসির অধীন অনুষ্ঠিত বিভিন্ন প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন বা অপেক্ষায় আছেন। এ সময়ের মধ্যে ৩৭তম বিসিএসের নন-ক্যাডার দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১ হাজার ৩৬৫ জন নিয়োগ পেয়েছেন। ৩৮তম বিসিএসে ২ হাজার ২০৪ জন নিয়োগ পেয়েছেন। এ ছাড়াও ৪ জানুয়ারি ৪০তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এ নিয়োগ থেকে অপেক্ষমাণ তালিকা করার দাবি জানিয়েছেন প্রার্থীরা। তারা জানান, যে শিক্ষক সংকট চলছে, তাতে শূন্য পদের অপেক্ষমাণ তালিকা করা জরুরি। সরকারি নিয়োগে অপেক্ষমাণ তালিকা থাকলে কোনো পদ শূন্য থাকবে না। প্রার্থীরা আরও জানান, ১ হাজার ৩৭৮টি পদের বিপরীতে তারা পাস করেছেন ৭ হাজার ১৬১ জন। পরে পদ বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৯৯টি করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সরকারি হাইস্কুলের মৌখিক পরীক্ষার প্রার্থী মোঃ কামাল হোসাইন বলেন, ২০১৮ সালের সার্কুলার হয়েও এখনো নিয়োগ পক্রিয়া সম্পূর্ণ হয় নি। নিয়োগের দীর্ঘশত্রæতা ও করোনার কারণে আমাদের অনেকের বয়স শেষ হয়ে যাবে। নিয়োগ প্রার্থীদের এই বিষয় গুলো বিবেচনা করে মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী কার্যকরী ভ‚মিকা পালন করবে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) বরিশাল আঞ্চলিক পরিচালক অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, বরিশাল বিভাগের ২২টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট ভয়াবহ। স্থায়ী প্রধান শিক্ষক মাত্র ৪টি স্কুলে। তিনি মাউশিকে পরিসংখ্যানে দেখিয়েছেন, স্কুলগুলোতে গড়ে ৩৮ ভাগ শিক্ষক নেই। তবে বরিশাল নগরীর দুটি স্কুল বাদ দিলে এ পার্সেন্টিজ দাঁড়াবে ৫০ শতাংশ। তিনি জানান, চলতি সপ্তাহে মাউশির পরিচালককে (মাধ্যমিক) এ বিষয়ে লিখিত তথ্য দিয়েছেন। দীর্ঘদিন শিক্ষক নিয়োগ এবং পদোন্নতি বন্ধ থাকায় এ জট সৃষ্টি হয়েছে বলে প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, প্রত্যন্ত এলাকা বিশেষ করে ভোলার দৌলতখান, পিরোজপুরের কাউখালী এবং বরগুনার বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা খুবই খারাপ।
বরগুনা সরকারি বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আজহারুল হক জানান, ৫২ জন শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৫ জন। মাত্র ১৫ জন শিক্ষক দুই শিফটে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীকে পাঠদান অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বরগুনা সরকারি বালক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাহমুদ চৌধুরী জানান, তার প্রতিষ্ঠানে ৫১ শিক্ষক পদের বিপরীতে আছে ২২ জন।
শহীদ আরজুমনি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির ছাত্র মোঃ লিয়ন বলেন, তাদের স্কুলে প্রচুর শিক্ষক সংকট রয়েছে। শিক্ষকের অভাবে তাদের ক্লাস সঠিক ভাবে নিতে স্যাররা হিমশিম খাচ্ছেন। এক এক বিষয়ে শিক্ষক থাকার কথা ২/৩ জন, তাতে দেখা যাচ্ছে শিক্ষক আছে মাত্র ১জন। যে কোন মূল্যে শিক্ষার্থীরা এই শিক্ষক সংকট দূর করার জন্য সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছে। বরিশাল শহীদ আবদুর রব সেনিয়াবাত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পাপিয়া জেসমিন বলেন, শিক্ষক সংকট রয়েছে। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে গনিত বিষয়ে একজন শিক্ষক কম দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নির্মিত ৭ স্কুলেই সহকারী প্রধান শিক্ষক দেয়া হয়নি। যার কারণে কাজকর্ম ব্যাপক বেগ পেতে হচ্ছে। এ জন্য ডিজি ও ডিডিকে চিঠির মাধ্যমে জানানো হয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক প্রফেসর ড. সৈয়দ মো: গোলাম ফারুক বলেন, ‘ভাইবা পরীক্ষা শেষে হয়ে গেছে। এই দুই হাজার নিয়োগ দিলে আমাদের কোঠা পুরণ হয়ে যাবে। শুধু মাত্র লিখিত পরীক্ষা নয়, মৌখিক ও লিখিত পরীক্ষার সমন্বয়ে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। আর এই নিয়োগে সংকট কমে যাবে।’ এব্যাপারে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) স্কুলের শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য আবদুল মান্নান বলেন, এখন ১৯৯৯ জন নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। আর এই দেয়ার সময়ে আরো কিছু পদ খালি হতে পারে। শূন্য হতে পারে অনেক পদে। এসব পদে যদি মাওসি জনবল দিতে চায় তবে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকেই নিয়োগ দেয়া হবে। আমরা এই করোনা কালেও চ্যালেঞ্জ নিয়ে এই নিয়োগের কাজটি করেছি। যেন শিক্ষক সংকট লাগব হয় ও কর্মসংস্থানের সংখ্যা বাড়ে। ##

যুগান্তর