প্রসঙ্গটা ২০২০ সালের এইচ. এস.সি পরীক্ষার্থীদের। করোনা মহামারির এই সময়ে বাংলাদেশে সবচেয়ে হতভাগা মনে হয় এই প্রায় চৌদ্দ লক্ষ শিক্ষার্থী।এ বছর ১ এপ্রিল এদের পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল।সে অনুসারে এই শিক্ষার্থীরা তাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিল। করোনা মহামারির কারণে ১৯ মার্চ সরকার তাদের পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করেছিল। নানা রকমের উৎকন্ঠা, খবর এবং গুজবের মধ্য দিয়ে ৬ মাসেরও অধিক সময় তাদেরকে পার করতে হয়েছে,তাদের সম্পর্কে সরকারি একটা সঠিক এবং নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়। নানা খবর এবং গুজবে এইসব শিক্ষার্থীরা পর্যুদস্ত এবং বিপর্যস্ত হলেও শিক্ষামন্ত্রীর পক্ষ থেকে বার বার বলা হয়েছিল – কোনভাবেই এদের পরীক্ষা বাতিল করা হবে না। করোনা মহামারি শেষ পর্যন্ত তাঁর এই আশ্বাসকেই গুজবে পরিণত করে দিল।
৭ অক্টোবর শিক্ষামন্ত্রীই ঘোষণা করলেন ২০২০ সালের এইচ.এস.সি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে না। প্রস্তুত কোন নীতিমালা ছাড়াই তিনি এ ঘোষণা দিলেন। বলা হলো, জে.এস.সি এবং এস. এস.সি পরীক্ষার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে এই রেজাল্ট দেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞ কমিটি তৈরী করা হবে, তাঁরা ঠিক করবেন এই রেজাল্ট কিভাবে তৈরী করা হবে। এও বলা হয়েছিল ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই রেজাল্ট দেওয়া হবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় রেজাল্ট তৈরী করা হবে তা আগেই জানিয়ে দেওয়া হবে। এ পর্যন্ত রেজাল্টতো দেওয়া হয়ইনি, কোন প্রক্রিয়ায় রেজাল্ট দেওয়া হবে তাও স্পষ্ট করা হয়নি।
প্রায় চৌদ্দ লক্ষ শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকগণ সরকারের অস্পষ্টতার খেসারত দিয়ে চলেছেন। নানা প্রকারের খবর এবং গুজবে তারা আক্রান্ত,ক্লান্ত এবং বিপর্যস্ত! ঘোষণা দেওয়ার সময় শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন, জে. এস.সি এবং এস.এস.সি’র ফলাফলের উপর ভিত্তি করে এইচ. এস. সি’র ফলাফল তৈরী করা হবে। যারা বিভাগ পরিবর্তণ করেছে এবং অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে যে সামান্য জটিলতা থাকবে তার সমাধানে বিশেষজ্ঞ কমিটি তাঁদের সুচিন্তিত মতামত দেবেন।কিন্তু বিশেষজ্ঞ কমিটির সুচিন্তিত মত, যাঁদের চিন্তা করারই কথা নয় তাদেরও যেন জটিল চিন্তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে! শুধু দুশ্চিন্তাই নয়, এই কমিটির বরাত দিয়ে যে সব খবর এবং গুজব ঘুরে বেড়াচ্ছে সেগুলো এই সব শিক্ষার্থীদের রীতিমতো বিপর্যস্ত করে তুলেছে। শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণার আগেও শিক্ষা বিষয়ক সাংবাদিক নামধারী এরা এই শিক্ষার্থীদের বিপর্যস্ততার মধ্যেই রেখেছিল।রেজাল্টদানের প্রক্রিয়া অস্পষ্ট থাকায় বা রাখায় এই সাংবাদিক নামধারীরা শিক্ষার্থীদের বিপর্যস্ত করে মানসিকভাবে অসুস্থ করে তুলছে। কথিত “ভিউয়ার্স” সন্ধানী এই সাংবাদিক নামধারীরা সাংবাদিকতার সমস্ত নীতি- নৈতিকতার কোন তোয়াক্কা না করলেও ভুক্তভোগীদের পক্ষে এদেরকে উপেক্ষা করাও সম্ভব নয়। কারণ বিপরীতে সঠিক তথ্য এবং সংবাদ মানুষের নাগালের বাইরেই যেন চলে গিয়েছ। এই অবস্থা সৃষ্টির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও কম দায়ী নয়। তথ্য অস্পষ্ট রেখে এরা যেন সাংবাদিক নামধারী এইসব অসৎ মানুষগুলোর ব্যবসা করার সুযোগই করে দিচ্ছেন।
এরা বিশেষজ্ঞ কমিটির বরাত দিয়ে বলছে ব্যবহারিক এবং চতুর্থ বিষয় হিসাবে না নিয়ে এইচ. এস. সি’ র ফলাফল নির্ধারণের সুপারিশ বিশেষজ্ঞ কমিটি করেছে! এতে করে জে. এস. সি এবং এস.এস.সি’র ফলাফল হিসাবে যে জিপিএ হয় তার চেয়ে জিপিএ কমে যাবে! শিক্ষার্থীদের কাছে এই খবর তাদের অর্জন কেড়ে নেওয়ার হুমকি। অর্থকড়ি কেড়ে নেওয়াই শুধু কেড়ে নেওয়া নয়, কারো অর্জন কেড়ে নেওয়া মানে তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করা। তাই এই ধরণের খবর বা গুজবে চৌদ্দ লক্ষ শিক্ষার্থী বিপর্যস্ত। শুধু শিক্ষার্থীই নয়, এই চৌদ্দ লক্ষ শিক্ষার্থীর অভিভাবকগণও দুশ্চিন্তার মধ্যে আছেন।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই ধরণের একটি অন্যয্য খবর বা গুজব যাই হোক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের এগুলো স্পষ্ট করা আশু দায়ীত্ব হওয়ার কথা।ব্যবহারিক এবং চতুর্থ বিষয় কি অসুবিধা সৃষ্টি করলো যে বিশেষজ্ঞ কমিটি এগুলো বাদ রাখার সুপারিশ করতে পারে? ব্যবহারিককে কি তারা গুরুত্বহীন মন করলেন? কেন? এই পদ্ধতি কে নির্ধারণ করেছে? সরকার,নাকি শিক্ষার্থীরা? তাহলে বিশেষজ্ঞ কমিটি কি সরকারের সিদ্ধান্ত মানেন না? যদি নাই মানেন, সে বুঝাপড়া সরকারের সাথেই করা উচিৎ। সে শাস্তি শিক্ষার্থীদের দেবেন কেন? চতুর্থ বিষয়ওতো সরকারেরই ব্যবস্থা। চতুর্থ বিষয়ের নাম্বার কি পড়ালেখা না করেই পাওয়া যায়? তাহলে এই বিষয়ের অর্জনকে বাদ দেওয়াও কি রীতিমতো শিক্ষার্থীদের উপর অবিচার নয়?তাদের অর্জিত ফল কেড়ে নেওয়া নয়? এগুলোতো কোন বিশেষজ্ঞের গবেষণার বিষয়বস্তু হতে পারে না। গবেষণা করে বিশেষজ্ঞগণ অনেক অসাধ্যকে সাধন করতে পারেন কিন্তু কোন একজনেরও সঠিক রেজাল্ট তৈরী করে দিতে পারেন না। গবেষণা করে কারো অর্জন কোন বিশেষজ্ঞ ঠিক করে দিতে পারেন না। তাই রেজাল্ট তৈরী নিয়ে কোন গবেষণার প্রয়োজন পড়ে না। শিক্ষার্থীদের অর্জন কেড়ে নেওয়ার গবেষণা তাদের সাথে চূড়ান্ত অবিচার।
তাই সরল পথ অনুসরণ করতে হবে। মূল্যায়ন করতে গিয়ে কারো অর্জনকে অবমূল্যায়ন করা যাবে না। এটা মানবিক আইনে কখনোই সিদ্ধ হতে পারে না। হিসাবে ব্যবহারিক না রাখা মানে শিক্ষার্থীর সেই অর্জনকে অবমূল্যায়ন করা। চতুর্থ বিষয়ের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। শিক্ষামন্ত্রণালয় এই কাজ করলে সেটা হবে রীতিমত বেআইনি।
রেজাল্ট তৈরীর সবচেয়ে গ্রহনযোগ্য উপায় হলো জিপিএর ক্ষেত্রে জে.এস.সি এবং এস. এ. সি’ র জিপিএ ভিত্তিক হিসাব করতে হবে। আর সাবজেক্ট অনুসারে জিপি’ র ক্ষেত্রে কার্ভ দেখা উচিৎ। যাদের সংশ্লিষ্ট সাবজেক্টে জে.এস.সি অপেক্ষা এস.এস.সি ভাল তাদের কেবল এস.এস.সি’র ফলই বিবেচনায় নিতে হবে। যাদের জে. এস.সি ভাল তাদের ক্ষেত্রে এস.এস.সি’র রেজাল্ট ওয়েটেড করে হিসাব করা উচিৎ,যাতে তাদের জিপি সামান্য হলেও বাড়ে। বাড়লে ক্ষতি হবে না কিন্তু তাদের এই বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে কমে গেলে সেটা হবে তাদের উপর মস্তবড় জুলুম। তাই এই পরিস্থিতিতে সরল এই নীতি ছাড়া রেজাল্ট নিয়ে যে কোন গভীর গবেষণা শিক্ষার্থীদের উপর অবিচার করা হবে।মনে রাখতে হবে এই শিকার্থীদের মধ্যে আছে আগামী দিনের বিজ্ঞানী, ডাক্তার,ইঞ্জিনিয়ার,শিক্ষক,আইনজীবী, বিচারক,পরিচালক,সবকিছু।
আমরা আশা করবো, শিক্ষামন্ত্রী খেয়াল রাখবেন আমাদের ভবিষ্যতের কোন সম্ভাবনার প্রতিই যেন কোন রকমের অবিচার করা না হয়। এই খেয়াল রাখা তাঁর জন্য গুরু দায়ীত্ব।এই শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকগণ এমনিতেই বিপর্যস্ত , তার পর তাদের উপর কোন রকমের অবিচার হলে সেটা অনেক ভারি হয়ে যাবে।
Faruque Ahmed