• ২২শে জুন, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ , ৮ই আষাঢ়, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বরিশালে করোনার টিকা বুকিংয়ের হিড়িক

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত জানুয়ারি ১৭, ২০২১, ০২:০৭ পূর্বাহ্ণ
বরিশালে করোনার টিকা বুকিংয়ের হিড়িক

বাণিজ্যিকভাবে বাজারে করোনার টিকা ছাড়ছে বেক্সিমকো। এমনটাই জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা। সবকিছু ঠিক থাকলে ফেব্রুয়ারিতে খোলা বাজারে আসবে এ টিকা। প্রতি ডোজের দামও নির্ধারণ হয়ে গেছে। ১ হাজার ১২৫ হিসাবে দুই ডোজের দাম পড়বে ২ হাজার ২৫০ টাকা। রাজধানীতে বেক্সিমকোর দায়িত্বশীলদের দেওয়া এসব তথ্য এরই মধ্যে ফলাও করে প্রচার করেছে বিভিন্ন গণমাধ্যম। এতে করে আগাম বুকিংয়ের হিড়িক পড়েছে। সরকারি টিকা পাওয়া-না পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকা অনেকেই আগেভাগে টিকার বুকিং দিয়ে রাখছেন বরিশালের প্রতিষ্ঠিত ওষুধের দোকানগুলোতে। টিকা আসার সঙ্গে সঙ্গে তারা যাতে এটি সংগ্রহ করতে পারেন সেই চেষ্টাই চলছে।

এদিকে কেন্দ্রীয়ভাবে বাজারজাতের ঘোষণা দেয়া হলেও বিষয়টি সম্পর্কে এখনো কিছুই জানেন না বলে দাবি বরিশালে বেক্সিমকোর দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের। ঢাকা থেকে তাদের কোনো গাইডলাইন কিংবা বাজার নিশ্চিতের নির্দেশনা দেয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন তারা।

এ মাসের শেষ নাগাদ দেশে করোনার টিকা আসবে বলে ঘোষণা দিয়েছে সরকার। জিটুজি পদ্ধতিতে বেক্সিমকোর মাধ্যমে ভারত থেকে আসছে এ টিকা। শুরু থেকেই সরকার বলে আসছে যে, বিনামূল্যে টিকা দেয়া হবে দেশের সাধারণ মানুষকে। প্রায়োরিটি নির্ধারণ করে ধাপে ধাপে দেওয়া হবে এ টিকা। ফেব্রুয়ারি থেকে টিকা দেয়া শুরু হবে। সেই লক্ষ্যে টিকাদানকারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়াসহ আনুষঙ্গিক অন্যান্য কার্যক্রমও শুরু হয়েছে ইতোমধ্যে। সরকারি এসব কর্মকাণ্ড চলার মধ্যেই বাণিজ্যিকভাবে টিকা বাজারজাতকরণের কথা বলে বেক্সিমকো। সরকারকে দেওয়ার পাশাপাশি খোলা বাজারে সরাসরি টিকা বিক্রি করা হবে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরানুযায়ী, সরকারিভাবে বিনামূল্যে দেওয়ার পাশাপাশি তারাও ফেব্রুয়ারিতেই টিকা ছাড়বে বাজারে। তাদের এ খবরে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি ওষুধের দোকানগুলোতে শুরু হয়েছে টিকার অগ্রিম বুকিং। বরিশাল নগরের প্রসিদ্ধ প্রায় সব ওষুধের দোকান থেকেই মিলেছে এরকম বুকিংয়ের খবর। যদিও এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলতে চাইছেন না। নগরের সদর রোডে থাকা হাবিব মেডিকেল হলের স্বত্বাধিকারী অরুন কুমার ঘোষ বলেন, শুনেছি আগামী মাসে করোনার টিকা বাজারে আনবে বেক্সিমকো। তবে আমাদের সঙ্গে এখন পর্যন্ত কেউ কোনো ধরনের যোগাযোগ করেনি। বেক্সিমকোর পক্ষ থেকেও বলা কিছু বলা হয়নি। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘অগ্রিম বুকিং ঠিক নয়, তবে পরিচিত অনেকেই বলে রাখছেন টিকা এলে রাখার জন্যে। পরিবারের সদস্য অনুযায়ী অনেকে সংখ্যাগত চাহিদাও দিচ্ছেন। আমরাও খাতায় তাদের চাহিদা লিখে রাখছি। টিকা এলে না হয় তারপর দেখা যাবে।’

হাবিব মেডিকেল হলের মতো বরিশালের প্রায় সব প্রসিদ্ধ ওষুধের দোকানেই চলছে অগ্রিম বুকিং। বটতলা এলাকার আল মুনিরী মেডিকেল শপের মালিক মুনির হোসেন বলেন, ‘ঘনিষ্ঠজনরা যেমন তাদের জন্য টিকা রাখতে বলছেন তেমনি অন্যরাও নিচ্ছেন খোঁজখবর। টিকার উপকার-ক্ষতি বিষয়েও জানতে চাইছে অনেকে। সরকারিভাবে প্রদেয় টিকা কবে নাগাদ পাওয়া যাবে কিংবা আদৌ পাওয়া যাবে কিনা- এসব ভাবনা থেকেই মূলত অগ্রিম খোঁজখবর নেয়া আর বুকিংয়ের চেষ্টা। তবে বেক্সিমকোর স্থানীয় দপ্তর এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কিছুই বলেনি আমাদের।’

টিকা বাজারজাত করার বিষয়ে জানতে চাইলে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের বরিশাল জেলার ব্যবস্থাপক কুতুবউদ্দিন আহম্মেদ বলেন, আপনাদের মতো আমরাও শুনেছি যে আমাদের প্রতিষ্ঠান আগামী মাসে করোনার টিকা বাজারে আনছে। তবে দাপ্তরিকভাবে এখন পর্যন্ত আমাদের কিছুই জানানো হয়নি।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘বেক্সিমকো তো আর নতুন প্রতিষ্ঠান নয়, মার্কেটিংয়ের সবকিছুই আমাদের নখদর্পণে। তাছাড়া টিকা সংরক্ষণ কিংবা পরিবহন প্রশ্নে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের যে বিষয়টি রয়েছে সেটিও আমাদের মাথায় আছে। প্রতিষ্ঠান যদি চায় তাহলে খুব কম সময়ের মধ্যেই আমরা টিকা ছড়িয়ে দিতে পারব। তাছাড়া বিভিন্ন ওষুধ বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে টিকার বিষয়ে। কেন্দ্র থেকে কোনো নির্দেশনা না মেলায় আমরা তাদের পরিষ্কার কোনো কিছু বলতে পারছি না। তারপরও হেড অফিস চাইলে খুব শিগগিরই আমরা সব ম্যানেজ করে ফেলতে পারব।’

করোনার টিকার বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করনের ঘোষণা নিয়েও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বিষয়টিকে সরকারের ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রমের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ বলছেন অনেকে। বরিশাল কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী মফিজুল ইসলাম কামাল বলেন, ‘বিষয়টি আমার কাছে বোধগম্য নয়। সরকার যেখানে সব নিয়ম-পদ্ধতি মেনে সারা দেশের মানুষের মধ্যে বিনামূল্যে টিকা দেয়ার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে সেখানে কেন বাণিজ্যিকভাবে টিকা বিক্রির ঘোষণা এলো? টিকা দেয়ার ক্ষেত্রে তাপ নিয়ন্ত্রিতভাবে সংরক্ষণ ও পরিবহণসহ বেশকিছু নিয়ম-পদ্ধতি অনুসরণের পাশাপাশি টিকা গ্রহীতাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণের মধ্যে থাকতে হবে। বাজার থেকে টিকা কিনে যদি ঘরে বসে দেয়ার সুযোগ করে দেয়া হয় তাহলে এসব বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করবে কারা? বরিশালে সব ওষুধ বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে আমি বলব যে, সব বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত এবং নিরাপত্তার বিষয়ে কোনোরকম আপস না করে যদি বিক্রির সুযোগ থাকে শুধু তাহলেই আমরা টিকা বিক্রি করব। নচেৎ নয়।’

বরিশালের স্বাস্থ্য বিভাগীয় পরিচালক ডা. বাসুদেব কুমার দাস বলেন, ‘সরকারি নির্দেশনা এবং ভ্যাকসিন প্রো-বিধি অনুযায়ী সেরামের কভিশিল্ড টিকা ২ থেকে ৮ ডিগ্রি তাপমাত্রায় সংরক্ষণ এবং পরিবহণ করতে হবে। তাছাড়া কোল্ড বক্স থেকে বাইরে আনার ৬ ঘণ্টার মধ্যে এটি ব্যবহারের পাশাপাশি ওই ৬ ঘণ্টাও রাখতে হবে আইস প্যাকের ওপরে। তাছাড়া সরকারিভাবে টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু স্বাস্থ্য কেন্দ্রে টিকা প্রদান এবং টিকা দেওয়ার পর কমপক্ষে ৩০ মিনিট টিকা গ্রহীতাকে স্বাস্থ্য কেন্দ্রেই অবস্থান করতে হবে। টিকা গ্রহণের পর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেলে যাতে তাৎক্ষণিকভাবে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়া যায় মূলত সেজন্যেই এ ৩০ মিনিটের অপেক্ষা। দেশব্যাপী টিকা প্রদান প্রশ্নে এভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছি আমরা। স্বাস্থ্য নিরাপত্তার এসব বিষয়গুলো মেনে কেউ যদি বাণিজ্যিকভাবে টিকা বাজারজাত করতে পারে তাহলে ক্ষতি কি? তবে যেহেতু এ বিষয়টির সঙ্গে আমি সংশ্লিষ্ট নই তাই এর বেশি কিছু বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’