• ২১শে জুন, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ , ৭ই আষাঢ়, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বেতাগীতে নিম্ন আয়ের মানুষের আতঙ্ক লকডাউন, করোনা নয়!

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত এপ্রিল ২৩, ২০২১, ২২:৪৪ অপরাহ্ণ
বেতাগীতে নিম্ন আয়ের মানুষের আতঙ্ক লকডাউন, করোনা নয়!

সৈয়দ নূর-ই-আলমঃ
দোকানে দোকানে পানি ব্যাচতাম (বিক্রি করতাম), প্রতি কলস পানি পাঁচ টেয়া হইর্্যা (৫টাকা করে) যা পাইতাম হ্যা দিয়েই চলতো সংসার। করোনা ভাইরাসের কারনে সারাদেশ লকডাউন, বেতাগীর দোকানপাটও বন্ধ থাকে তাই পানিও ব্যাচতে পারিনা। রমজান মাসে ইফতারির জন্য হোটেলে বেশিই পানি বিক্রি করতে পারতাম এখন খালি কলসি নিয়া ঘুরে যাই দুই চার কলসও ব্যাচতে পারিনা এমন চললে ভাইরাস লাগবে না, খাওনের অভাবেই মইরা যামু। কথাগুলো বলছিলেন বেতাগী পৌরসভার ৩ নং ওয়ার্ডে ৫০বছর বয়সী বৃদ্ধা নুরজাহান বিবি। যিনি পানি বিক্রির জন্য বেতাগীতে জলদেবী নামে পরিচিত।
দেশজুড়ে করোনা ভাইরাসের পরিস্থিতির কারণে চলমান লকডাউন আরো বাড়ানোয় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। অন্য দিকে লকডাউনে নানা শ্রেনী পেশার মানুষের রুজি-রোজগার বন্ধ। জীবন-জীবিকা নিয়ে তাই চিন্তায় পড়েছেন নি¤œ আয়ের মানুষ। তারা বলছেন, নিম্ন আয়ের মানুষ করোনাকে ভয় পায় না, ভয় পায় লকডাউনকে। এখন তাদেও মধ্যে করোনার চেয়েও লকডাউন বড় আতঙ্ক। চলতি লকডাউনের কারণে এমনিতেই বেশ কিছু দিন মানবেতর দিন পার করছেন তারা। এর মধ্যে আরও সাত দিনের লকডাউন বাড়ানোর ঘোষণা তাদের কাছে ‘মরার উপর খরার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে।
বেতাগী উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষদের সাথে কথা বললে জানা যায়, জমানো টাকা যা ছিল, তা দিয়ে ও ধার করে লকডাউনের সাত দিন পার হয়েছে। আরও সাত দিন লকডাউন বাড়ানোয় সামনের দিনগুলো কীভাবে পার করবেন, তা ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছেন না। এখন পর্যন্ত কেউ নাকি কোন ধরনের সাহায্যেরও হাত বাড়ায়নি। উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করা রিক্সাচালক, অটোচালক, দিনমজুরসহ খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে এমনটাই জানা গেছে।
উপজেলার বিবিচিনি ইউনিয়নের বাসিন্দা রিক্সাচালক বশির বলেন, ‘লকডাউনে অনেক চিন্তার মধ্যে দিন পার করেছি। কীভাবে চলব পরিবার-পরিজন নিয়ে। আমরা রিক্সাচালকরা ‘দিন আনি দিন খাই’। আমাদের জমানো টাকা থাকে না। এ জন্য সমস্যায় পড়তে হয়। আরও সাত দিন লকডাউন বাড়ল।করোনা ভাইরাসের ভয়তো পরের কথা বর্তমানেই তো খেয়ে বেঁচে থাকা দায়। এখন কী খাব, কী করব কিছুই মাথায় আসছে না।
অটোচালক হারুন বলেন, ‘কঠোর লকডাউনে প্রথম দুই দিন অটো চালিয়ে ছিলাম। কিন্তু পুলিশ আটকে রাখে ও জরিমানাও করে। যাকে বলে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। এমনিতেই ভাড়া নেই, তার ওপর আবার জরিমানা গুনতে হলেতো একদম দিনটাই মাটি। জমানো যা ছিল, তাও শেষ। এখন পরিবার নিয়ে কী খাব, সেটাই চিন্তা করছি।’
দিনমজুর পনু মিয়া বলেন, ক’দিন ধরে সকালে আসলেও, লকডাউনে কাজ না থাকায় ফিরে যেতে হচ্ছে। দুঃখভারা মুখ নিয়ে তিনি বলেন, ছোট ছোট পোলাপান সামনে ঈদ, এমন চলতে থাকলে ওদের যে কিছু কিনে দিবো তাও পারবো না। ‘কারো কাছে হাতও পাততে পারি না। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন জানান, এক সপ্তাহ লকডাউন বাড়িয়ে আমাদের দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। চলতি লকডাউন পার করতেই আমরা কাহিল হয়ে পড়েছি। সামনের এই এক সপ্তাহ কীভাবে চলবো তা নিয়ে খুব চিন্তায় আছি।
এই লকডাউনে মহাদুর্বিপাকে সবচেয়ে বিপন্ন অবস্থায় পড়েছে দৈনিক খেটে খাওয়া হতদরিদ্র মানুষ। অনাহারে, অর্ধাহারে নিত্যজীবন কাটানো এক দুঃসহ করুণ অবস্থা তাদের। গণপরিবহন চালক, রিকশা, ভ্যান ও অটোচালকরাও পড়েছে সঙ্কটাপন্ন পরিস্থিতিতে। প্রতিদিনের আয় না থাকায় জমাকৃত টাকা খরচ করেও তারা পার পাচ্ছেন না। এমন দুরবস্থায় সরকারি অর্থ ও খাদ্যপণ্য সহায়তা নেই। একজন নিম্ন আয়ের দিন আনা, দিন খাওয়া মানুষের পক্ষে বসে থেকে এক সপ্তাহ পার করা খুব দুর্বিষহ ব্যাপার। যেহেতু এক সপ্তাহ পার হয়েছে, আবার এক সপ্তাহ লকডাউন বাড়ানো হয়েছে। এখন নিম্ন আয়ের মানুষের ঘরে ঘরে খাদ্যসংকট তীব্রভাবে দেখা দিয়েছে। তাদের দাবি, এই দুঃসময়ে সরকারি সহযোগিতার।