চরফ্যাসন প্রতিনিধি \
‘শব-ই-কদরের সন্ধ্যায় বউ মোবাইলে ফোন দিয়া কইছে- ঈদ অইবো না ? কইছি-‘আলাহ’র দিগে চাইয়া থাহো’ । ঈদের প্রস্ততি সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢালচর ঘাটের সমুদ্রগামী ফিশিং ট্রলারের প্রধান মাঝি অহিদ বেপারী সংক্ষেপে এমন জবাব দিয়েছে। ভোলার চরফ্যাসন উপকূলের ৪০ হাজার জেলে পরিবারের ঈদ হতাশার কষ্টটা যেন অহিদ বেপারীর মুখে ফুটে উঠেছে।
চরফ্যাসন উপকূলের ৪০ হাজার পরিবারের প্রধান পেশা ইলিশ মাছ ধরা। চলতি মৌসুমে ইলিশের আকাল এবং রমজান মাসের শুরু থেকে ইলিশেল মূল্য পতনের কারণে জেলে পলীগুলোতে চলছে হাহাকার। তার উপর জেলেপলীগুলোতেও এসেছে সার্বজনীন ঈদ। ঈদ নিয়ে সর্বত্র অন্যরকম প্রস্তুতি থাকলেও ব্যতিক্রম জেলে পলীগুলো। অহিদ বেপারী জানান, বুধবার সন্ধ্যায় ৬দিন পর ১৯ জন সঙ্গীয় মালাকে নিয়ে ঘাটে ফিরেছেন ২১ হালি মাছ নিয়ে । বিক্রি করেছেন ২৪ হাজার টাকা। কিন্তু ৬দিনের ট্রিপ খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। মৌসুমের শুরু থেকে লোকসানের পরিমান বড়ার সাথে বাড়ছে দেনার পরিমান। এখন পর্যন্ত মহাজন থেকে দাদন নেয়া হয়েছে ৬ লাখ টাকা, মুদি দোকানে বাকী পড়েছে ৭৫,৪০০ টাকা, পানের দোকানে বাকী ৪,৫০০ টাকা, কাচাঁ বাজারের বাকী ৯০০০ টাকা। দেনা করতে করতে এখন আর কেউ বাকীও দিতে চায় না।তারপরও মাস শেষে কয়েকজন স্টাফকে বেতন বাবদ দিতে হবে আরো ৭০,০০০ টাকা। নিত্য লোকসানের তোড়ে ঈদের আনন্দটাও যেন ভেসে গেছে। নদীতে ইলিশ উৎপাদন বাড়াতে মার্চ-এপ্রিল দুই মাস নিষেধাজ্ঞা ছিল নদীতে। করোনার কারণে এই দুই মাস জেলেরা অন্য কোন কাজও করতে পারেনি ।
পটুয়াখালীর কালিশুরীর এই জেলে জানান, বাড়িতে ২টি মেয়েসহ ৪টি সন্তান নিয়ে বউ অপেক্ষা করছে। কিন্তু বুধবার সন্ধ্যায় ঘাটে ফেরার পর আবার সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছি। ঈদটা সাগরেই কাটবে। বাড়ি আর যাওয়া হবে না। কেনই বা যাবো। বউ-বাচ্ছাদের জন্য কী নিয়ে যাবো। ঈদে শূণ্য হাতে বাড়ি ফেরার কষ্টের চেয়ে না ফেরার কষ্টটা বেশী হবে না । খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, ঢালচর,কুকরী, সামরাজ, বেতুয়াসহ গোটা জেলেপলীগুলোর দৃশ্যটা প্রায় একই। জেলে পরিবার গুলোর স্ত্রী সন্তানরা ঈদে বাড়তি কিছু পাওয়ার আশায় পরিবার প্রধানের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্ত দেনায় জর্জরিত পরিবার প্রধান পরিবারের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার কষ্ট আড়াল করতে ঈদের দিনটি উত্তাল সমুদ্রে ভেসে কাটাতেই ঈদকে সামনে রেখে চলে যাচ্ছে দূর সমুদ্রে । ঢালচর ঘাটের বিসমিলাহ আড়তের কেরানী নূর-ই-আলম জানান, মৌসুমের থেকে নদী-সমুদ্র ইলিশ শূণ্য ছিল। রমজানের শুরু থেকে কিছু মাছ ধরা পড়লেও দাম মিলছেনা। নূর-ই-আলম জানান, বুধবার তার আড়তে সমুদ্র থেকে ৭টি ট্রলার ১২ পোন মাছ নিয়ে ফিরেছে। এসব মাছের বিক্রি মূল্য এসেছে ২,৫০,০০০ টাকা। কিন্ত ট্রলারগুলোর ট্রিপ খরচ হয়েছে কমপক্ষে ৩,৫০,০০০ টাকা। রমজানের শুরু থেকে কিছু মাছ ধরা পড়লেও ১০ রমজান থেকে দাম পড়ে যাওয়ায় জেলেরা লোকসানের মধ্যে পড়েছে। আড়তদার মহিবুল্লাহ বলেন, এখন নদীতে ইলিশ নেই, তাই জেলেরাও কষ্টে আছে, আমরাও লোকসানের মুখে রয়েছি। সামনে ঈদ সবার আশা ছিলো অন্তত ঈলিশ বিক্রির টাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে ভালোভাবে ঈদ করবেন কিন্তু মাছ সংকটের কারণে সবারমæখ মলিন হয়ে গেছে। জেলেদের দাদন দিয়ে আমরাও ভালো নেই।
এ ব্যাপারে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মিনার হোসেন মারুফ বলেন, এ মুহুর্তে নদীতে ইলিশের সংকট রয়েছে, তবে আগামী দু’একমাসের মধ্যে ইলিশ ধরা পড়লে জেলেদের দুন্দিন কেটে যাবে।