ট্রান্স ফ্যাটি এসিড (টিএফএ) বা ট্রান্সফ্যাট – মানব স্বাস্থ্যের জন্য বিষাক্ত এবং অযাচিত খাদ্য উপাদান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আহ্বান করেছে ২০২৩ সালের মধ্যে বিশ্ব খাদ্য সরবরাহ থেকে শিল্পোৎপাদিত ট্রান্সফ্যাট নির্মূল করতে। তারই প্রেক্ষিতে ২৯ নভেম্বর বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ সরকারী গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে “খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্স ফ্যাটি এসিড নিয়ন্ত্রণ প্রবিধানমালা, ২০২১”। এই প্রবিধানমালায় বলা হয়েছে যে ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বরের পর থেকে বাংলাদেশের ভেতরে কোনও তেল, ফ্যাট ও খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্সফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা মোট ফ্যাটের ২ শতাংশের বেশী থাকতে পারবে না। নিরাপদ খাদ্য আইনের আওতায় এই প্রবিধানমালা লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড বা ১২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দণ্ডিত হবে।
প্রবিধানমালাটি বাস্তবায়ন করার পথ-নকশা বা রোড-ম্যাপ নিয়ে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয় গত ৬ ডিসেম্বর যেখানে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় খাদ্য মন্ত্রী ও খাদ্য সচিব।
মূলত ট্রান্সফ্যাট হচ্ছে খাদ্যের এক প্রকার ডায়েটারি ফ্যাট বা স্নেহ জাতীয় খাদ্য উপাদান যার স্বাস্থ্য ক্ষতি বহুমুখী। খাদ্যের সাথে ট্রান্সফ্যাট গ্রহণের ফলে রক্তের এলডিএল বা “খারাপ কোলেস্টেরল” বৃদ্ধি পায়, অপরদিকে এইচডিএল বা “ভালো কোলেস্টেরল”-এর মাত্রা কমে যায়। অতিরিক্ত ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণের ফলস্বরূপ রক্তবাহী ধমনিতে খারাপ কোলেস্টেরল জমা হয়ে রক্তচলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। মাত্রাতিরক্ত ট্রান্সফ্যাট গ্রহণের ফলে হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক, হৃদরোগজনিত মৃত্যু, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, স্তন ক্যান্সার, প্রোস্টেট ক্যান্সার, স্মৃতিভ্রংশ (ডিমেনশিয়া), স্বল্প স্মৃতিহানি (কগনিটিভ ইমপেয়ারমেন্ট), জাতীয় রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে যে রাগ, মানসিক চাপ, আক্রমণাত্মক ব্যবহার, খিটখিটে ও বিরক্ত লাগা, এমনকি বয়ঃসন্ধিকালে ডিপ্রেশনে ভোগার আশঙ্কাও বাড়িয়ে তোলে খাবারের মাঝে লুকিয়ে থাকা ট্রান্সফ্যাট। এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে যে বাংলাদেশে ২০১৯ সালে ১২ হাজার মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে শুধুমাত্র ট্রান্সফ্যাট যুক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে।
২০২০ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে বিশ্বের ১৫টি দেশে ট্রান্সফ্যাট-ঘটিত হৃদরোগজনিত মৃত্যু ঝুঁকি সবচেয়ে বেশী যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম এবং বাংলাদেশের ৪.৪১% হৃদরোগজনিত মৃত্যুর জন্য দায়ী খাদ্যের ট্রান্সফ্যাট। ট্রান্সফ্যাট-ঘটিত হৃদরোগ ও হৃদরোগজনিত মৃত্যু ঝুঁকি থেকে উত্তরণের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সুপারিশ করেছে খাদ্যদ্রব্যে শিল্পোৎপাদিত ট্রান্সফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা ২ শতাংশে নির্ধারণ করতে অথবা/এবং পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড অয়েল বা পিএইচও এর উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে।
খাদ্যে শিল্পোৎপাদিত ট্রান্সফ্যাটের প্রধান উৎস পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড অয়েল (পিএইচও), যা ডালডা বা বনস্পতি ঘি নামেই পরিচিত। সাধারণত বেকারি পণ্য, প্রক্রিয়াজাত ও ভাজা পোড়া স্ন্যাক্স এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ ও সড়কসংলগ্ন দোকানে খাবার তৈরিতে পিএইচও বা ডালডা ব্যবহৃত হয়। ২০১৯ সালে পরিচালিত একটি গবেষণায় ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষকদল ঢাকার শীর্ষস্থানীয় পিএইচও (পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড অয়েল) ব্র্যান্ডসমূহের নমুনার ৯২ শতাংশে ডব্লিউএইচও সুপারিশকৃত ২% মাত্রার চেয়ে বেশি ট্রান্সফ্যাট (ট্রান্স ফ্যাটি এসিড) এর উপস্থিতি পেয়েছেন।