• ২৫শে জুন, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ , ১১ই আষাঢ়, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে চাই ট্রান্সফ্যাট মুক্ত বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২২, ০৯:২৫ পূর্বাহ্ণ
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে চাই ট্রান্সফ্যাট মুক্ত বাংলাদেশ

“সু-স্বাস্থ্যের মূলনীতি, নিরাপদ খাদ্য ও স্বাস্থ্যবিধি” প্রতিপাদ্য নিয়ে গত ২ ফেব্রুয়ারি দেশ ব্যাপী পালিত হল জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস। ট্রান্সফ্যাট মুক্ত খাবার নিশ্চিত করতে সবধরনের ফ্যাট, তেল এবং খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্সফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা মোট ফ্যাটের ২ শতাংশ নির্ধারণ করে ২০২১ সালের ২৯ নভেম্বর তারিখে “খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্স ফ্যাটি এসিড নিয়ন্ত্রণ প্রবিধানমালা, ২০২১” সরকারী গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। এ অনুযায়ী খাদ্যদ্রব্যে ২ শতাংশের বেশি ট্রান্সফ্যাট পাওয়া গেলে নিরাপদ খাদ্য আইন লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে যার শাস্তি সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড বা ৩ থেকে ৬ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড।

ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক টেকনিক্যাল কমিটির সভাপতি ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি) মঞ্জুর মোর্শেদ আহমেদ বলেন, “প্রবিধানমালা কার্যকর করতে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় আছে। নির্ধারিত সময়ের পর না মানলে আইনের প্রয়োগ করা হবে। অনেক দেশ ১৫ থেকে ২০ বছর চেষ্টার পর ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণ করেছে। আমরা ধীরে ধীরে এটি কমানোর চেষ্টা করছি। ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বরের পরে আর মাত্রাতিরিক্ত ট্রান্সফ্যাট ব্যবহারের সুযোগ থাকছে না। গত ৬ ডিসেম্বর আমরা প্রবিধিমালা বাস্তবায়ন করতে খাদ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে মিটিং করেছি। এখন হাতে থাকা এক বছরের মধ্যে আমরা একটা রোডম্যাপ প্রণয়ন করবো। যাতে শিল্পোদ্যোক্তাদের সহায়তা করতে পারি। নিজস্ব ল্যাবের সক্ষমতা বাড়ানোসহ খাবার তৈরির সব স্তরেও সেটা বাস্তবায়ন এবং জনগণকে সে বিষয়ে সচেতন করতে পারি।‘আমরা এর মধ্যে সব স্তরের খাদ্য প্রস্তুতকারীদের চিঠি ও নির্দেশনা দেবো। এ বিধান মানতে প্রয়োজনীয় সব সহায়তা দেওয়া হবে। এ নিয়ে ব্যবসায়ীদের কোনো দ্বিমত ছিল না। খাদ্য ব্যবসায়ীসহ সব পক্ষের মতামতের পরই এটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। তারা শুধু সময় চেয়েছিল, এজন্য এক বছর দেওয়া হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, মাত্রাতিরিক্ত ট্রান্সফ্যাট রুখতে আমরা সফল হবো।”

মানব স্বাস্থ্যের জন্য বিষাক্ত এবং অযাচিত খাদ্য এক উপাদান ট্রান্স ফ্যাটি এসিড (টিএফএ) বা ট্রান্সফ্যাট। মূলত ট্রান্সফ্যাট হচ্ছে খাদ্যের এক প্রকার ডায়েটারি ফ্যাট বা স্নেহ জাতীয় খাদ্য উপাদান যার স্বাস্থ্য ক্ষতি বহুমুখী। খাদ্যের সাথে ট্রান্সফ্যাট গ্রহণের ফলে রক্তের এলডিএল বা “খারাপ কোলেস্টেরল” বৃদ্ধি পায়, অপরদিকে এইচডিএল বা “ভালো কোলেস্টেরল”-এর মাত্রা কমে যায়। অতিরিক্ত ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণের ফলস্বরূপ রক্তবাহী ধমনিতে খারাপ কোলেস্টেরল জমা হয়ে রক্তচলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। মাত্রাতিরক্ত ট্রান্সফ্যাট গ্রহণের ফলে হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক, হৃদরোগজনিত মৃত্যু, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, স্তন ক্যান্সার, প্রোস্টেট ক্যান্সার, স্মৃতিভ্রংশ (ডিমেনশিয়া), স্বল্প স্মৃতিহানি (কগনিটিভ ইমপেয়ারমেন্ট), জাতীয় রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে যে রাগ, মানসিক চাপ, আক্রমণাত্মক ব্যবহার, খিটখিটে ও বিরক্ত লাগা, এমনকি বয়ঃসন্ধিকালে ডিপ্রেশনে ভোগার আশঙ্কাও বাড়িয়ে তোলে খাবারের মাঝে লুকিয়ে থাকা ট্রান্সফ্যাট। এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে যে বাংলাদেশে ২০১৯ সালে ১২ হাজার মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে শুধুমাত্র ট্রান্সফ্যাট যুক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে।

বিশ্বব্যাপী হৃদরোগ ঝুঁকি হ্রাস করতে ২০২৩ সালের মধ্যে বিশ্ব খাদ্য সরবরাহ থেকে শিল্পোৎপাদিত ট্রান্সফ্যাট নির্মূল করতে আহ্বান করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ২০২০ সালে প্রকাশিত উক্ত সংস্থার এক প্রতিবেদনে জানানো হয় যে বিশ্বের ১৫টি দেশে ট্রান্সফ্যাট-ঘটিত হৃদরোগজনিত মৃত্যু ঝুঁকি সবচেয়ে বেশী যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম এবং বাংলাদেশের ৪.৪১% হৃদরোগজনিত মৃত্যুর জন্য দায়ী খাদ্যের ট্রান্সফ্যাট। ট্রান্সফ্যাট-ঘটিত হৃদরোগ ও হৃদরোগজনিত মৃত্যু ঝুঁকি থেকে উত্তরণের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সুপারিশ করেছে খাদ্যদ্রব্যে শিল্পোৎপাদিত ট্রান্সফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা ২ শতাংশে নির্ধারণ করতে অথবা/এবং পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড অয়েল বা পিএইচও এর উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে।

খাদ্যে শিল্পোৎপাদিত ট্রান্সফ্যাটের প্রধান উৎস পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড অয়েল (পিএইচও), যা ডালডা বা বনস্পতি ঘি নামেই পরিচিত। সাধারণত বেকারি পণ্য, প্রক্রিয়াজাত ও ভাজা পোড়া স্ন্যাক্স এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ ও সড়কসংলগ্ন দোকানে খাবার তৈরিতে পিএইচও বা ডালডা ব্যবহৃত হয়। ২০১৯ সালে পরিচালিত একটি গবেষণায় ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষকদল ঢাকার শীর্ষস্থানীয় পিএইচও (পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড অয়েল) ব্র্যান্ডসমূহের নমুনার ৯২ শতাংশে ডব্লিউএইচও সুপারিশকৃত ২% মাত্রার চেয়ে বেশি ট্রান্সফ্যাট (ট্রান্স ফ্যাটি এসিড) এর উপস্থিতি পেয়েছেন।

জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস ২০২২ উপলক্ষ্যে এক প্রতিক্রিয়ায় গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা’র (প্রগতির জন্য জ্ঞান) নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের বলেন, “আমরা ট্রান্সফ্যাট মুক্ত নিরাপদ খাদ্য চাই। জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণ প্রবিধানমালা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।”