জনস্থান ও অন্যান্য জায়গায় নারী ও কন্যা শিশুদের ওপর যৌন হয়রানি ও নানাবিধ যৌন সহিংসতা বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাড়িয়েছে। একটি জরিপ অনুসারে দেখা যায়, ১০ থেকে ১৮ বছর বয়সী নারী ও কন্যা শিশুদের ৯০ শতাংশই রাস্তা, বাজার বা বিপণী কেন্দ্র, গণপরিবহনসহ অন্যান্য জনস্থানে যৌন হয়রানি, সহিংসতা ও অবাঞ্ছিত শারীরিক স্পর্শের শিকার হয় (অ্যাকশন এইডের জরিপ)। কোডিড-১৯ মহামারীর সময়টাতে নারীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও নানা ধরনের নিপীড়ন এবং যৌন হয়রানি বা সহিংসতার শিকার হচ্ছে। যা নারীর পূর্ণ সম্ভাবনা এবং জীবনের সবক্ষেত্রে অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮.২ এবং ৩৫ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রীয় ও জনজীবনের সবক্ষেত্রে নারীদের সমান অধিকার এবং চলাফেরার স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ অনুযায়ী শ্রমবাজার ও কর্মক্ষেত্রে সমান অধিকারসহ সব ধরনের জাতীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি বন্ধে ২০০৯ সালে নির্দেশনা জারি করেছেন মহামান্য হাইকোর্ট। তাছাড়া বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জনেও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এসডিজির ৫.২ লক্ষ্যমাত্রায় সকল পর্যায়ে নারী ও কন্যা শিশুর প্রতি সকল ধরনের সহিংসতা বন্ধের কথা বলা হয়েছে। নারী ও কন্যা শিশুদের অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশ নারীর প্রতি সকল ধরনের বৈষম্য বিলোপ সংক্রান্ত জাতিসংঘের (সিডও) সনদ এবং শিশু অধিকার সনদ (সিআরসি) অনুস্বাক্ষর করেছে। তবে প্রতীয়মান যে জনস্থানে নারী ও কন্যা শিশুদের ওপর হয়রানি বন্ধে বিদ্যমান আইন ও নীতিমালাগুলো যথেষ্ট নয়। অনলাইন প্ল্যাটফর্মসহ জনস্থানসমূহ নারীদের জন্য আরও নিরাপদ ও স্বস্তিকর করতে পর্যাপ্ত, সম্মিলিত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। তারপরও নানাবিধ চ্যালেঞ্জ থাকা স্তত্ত্বেও বাংলাদেশে জনস্থানে ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নারীদের উপস্থিতি প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
তাই জনস্থানে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তরুণ সংগঠকদের নিয়ে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়।উক্ত সভায় বরিশালের ইয়ুথ ফোরাম ফর সোশ্যাল জাস্টিস, বাংলাদেশ প্রতীকী যুব সংসদ, আরণ্যক, তারুণ্যের কণ্ঠস্বর, ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিস,নারীপক্ষ, স্বপ্নছোঁয়া যুব সংগঠন, ইয়ুথ ইনভারমেন্ট এন্ড ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি সহ আরো বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলো।উক্ত সভায় সভাপতিত্ব করেন ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিস এর সমন্বায়ক সোহানুর রহমান।
প্রথমে নারীদের প্রতি সহিংসতা বিভিন্ন পরিসংখ্যান দেখানো হয়।
• জনস্থানে নারীর প্রতি সহিংসতা সম্পর্কিত কিছু পরিসংখ্যান :
দেশের ৭টি মহানগরের ৮৪ শতাংশ নারী ও কন্যা শিশু অবমাননাকর ও যৌন কটূক্তিমূলক মন্তব্যের শিকার হয়ে থাকে।(অ্যাকশন এইডের জরিপ ২০১৫)
৯৪ শতাংশ নারী তাদের জীবনে কোন না কোনভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। যার ফলে অস্বস্তিকর অবস্থার সম্মুখীন হওয়ার কারণে ২০.৫ শতাংশ নারী গণপরিবহন ব্যবহার এড়িয়ে চলে।(ব্র্যাকের সমীক্ষা ২০১৮)কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ৭৬ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী অন্তত একবার যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে।
(ইউএন উইমেন, ২০১৩: বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ)শহর এলাকায় বসবাসকারী ৫৪.৭ শতাংশ নারী অপরিচিত ব্যক্তির দ্বারা শারীরিক, মানসিক, আর্থিক ও সামাজিক সহিংসতাসহ অবাঞ্ছিত শারিরীক স্পর্শের শিকার হয়ে থাকে।(অ্যাকশন এইডের জরিপ ২০১৮)
মতবিনিময় সভায় জনস্থানে নারীরা কিভাবে হেনস্থার শিকার হয় এবং এসব থকে কিভাবে আমরা উঠে আসতে পারি এ সকল বিষয়ে আলোচনা করা হয়। এছাড়া নারীরা হেনস্তা বা নির্যাতনের শিকার হলে আমরা কাদের কাছে সাহায্য পেতে পারি বা আমাদের অংশীদার কারা এবং আমরা কি কি পদক্ষেপ নিতে পারব এসব নিয়েও আলোচনা করা হয়।
• ধর্ষণ প্রতিরোধে আলোচনা
ধর্ষণ সংস্কৃতিকে নির্মূল করতে নিজের বন্ধুবান্ধব, সমবয়সী এমনকি স্ব স্ব কমিউনিটিতে পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য মুক্ত আলোচনা করতে হবে। পরিবারের মধ্যেই খোলামেলা আলোচনায় পরিকল্পনা গ্রহণ করে, গোড়া থেকে নির্মূল করতে হবে এই ব্যাধি। আলোচনার মাধ্যমেই সমাজের সৃষ্ট বিভিন্ন গুরুতর সমস্যাগুলো থেকে বের করে আন সম্ভব ।
• আগামী প্রজন্মকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলুন
ধর্ষণ মুক্ত সমাজ বিনির্মাণে আগামী প্রজন্মকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই। অধিকার সংরক্ষণে সচেতন ভূমিকা রাখতে, আগামী প্রজন্মকে শিক্ষা ও জ্ঞানের দিক দিয়ে সমৃদ্ধ করতে হবে। বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গড়ে তুলতে, সামগ্রিকভাবে প্রচেষ্টা চালাতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে সংবেদনশীল তথ্যগুলো প্রচারের ব্যবস্থা নিতে হবে।
• সক্রিয় বাইস্ট্যান্ডার হউন
একজন সক্রিয় bystander হিসেবে সকল ধরনের সহিংসতা ও নিপীড়নের সুযোগকে প্রতিহত করুন। সরাসরি হস্তক্ষেপ করে সহিংসতাকারীকে জানান দিন, তার আচরণ অগ্রহণযোগ্য ও তার দ্বারা সংঘটিত কর্মকাণ্ড অপরাধের সামিল যা সরাসরি নাগরিক অধিকারকে খর্ব করে। সহিংসতার শিকার মানুষকে সুরক্ষিত রাখতে সহায়তা করুন, অপরাধীদের সরাসরি ইঙ্গিত দিন তার অপরাধ সম্পর্কে। স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নিন।
• দায়মুক্তি দেয়া বন্ধ করুন
ধর্ষণ সংস্কৃতি প্রতিহত করতে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপরাধীকে অনতিবিলম্বে সুষ্ঠু জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। দায়মুক্তি দেয়ার বিরুদ্ধে জোড়ালো প্রতিবাদ করতে হবে এবং চ্যালেঞ্জ করতে হবে সকল অন্যায় ও পক্ষপাতদুষ্ট দায়মুক্তির বিরুদ্ধে।
• সরাসরি যুক্ত হউন
নাগরিক সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা ছাড়া কোন অপশক্তিকে প্রতিহত করা দিবাস্বপ্ন! ধর্ষণের মত অপরাধ নির্মুল করতে সমাজের সর্বস্তরের নাগরিকদের বিবেক জাগ্রত করে স্বতঃস্ফূর্ত সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে।
• ধর্ষণ নিয়ে হাসিঠাট্টা বন্ধ করুন
ধর্ষণের মত স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে সকল ধরনের কৌতুক, হাসিঠাট্টা, বিদ্রুপ ও অপপ্রচার বন্ধ করতে সচেতন ভূমিকা পালন করতে হবে। ধর্ষণ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কোন ছাড় নয়।
• সহিংসতার শিকার নারীদের কথা শুনুন।
সহিংসতার শিকার নারীদের কথা শুনুন, তাদের বিশ্বাস করুন এবং অভয় দিন। তাঁর মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে সহযোগিতা করুন। ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হোক আপনার আমার সচেতনার মাধ্যমেই।
• নারীদের জন্য বিনিয়োগ করুন
নারী ও মেয়েদের জন্য পরিকল্পিত বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যেন তারা একটি সুরক্ষিত ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ পায়। আমাদের কন্যাশিশুদের শিক্ষা গ্রহণের থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সময় পর্যন্ত – সর্বস্তরে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিতে, নারীদের অধিকার সংরক্ষণে কাজ করে এমন সংস্থাগুলোতে বিনিয়োগ সুনিশ্চিত করার ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে।Rape বা ধর্ষণকে বৈধতা দেয় এমন সকল ঘটনা, ইতিহাস কিংবা দলিলের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করুন। ইতিহাসে সবসময়ই ধর্ষণকে প্রতিশোধ, ক্ষোভ, স্বার্থসিদ্ধির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধ ও নিপীড়নের ক্ষেত্রে ধর্ষণ সংস্কৃতিকে একপ্রকার স্বাভাবিক আচরণের মতই গণ্য করা হয়েছে। তবে ধর্ষণ চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন যা কোনভাবেই বৈধতা পেতে পারে না।
• ধর্ষণ সংস্কৃতির ইতিহাস সম্পর্কে জানুন
• যৌন হয়রানির ক্ষেত্রে Zero Tolerance নীতি গ্রহণ করুন
Sexual Harassment এর বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চাই Zero Tolerance নীতি। আমাদের স্ব স্ব অবস্থান থেকেই যৌন সহিংসতা ও সকল প্রকার সহিংসতার বিরুদ্ধে জোড়ালো প্রতিবাদ করতে হবে। ধর্ষণ সংস্কৃতি প্রতিহত করতে চাই, ছাড় না দেয়ার মত শক্ত বিধান।
• সম্মতি গ্রহণের সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করুন।
সম্মতি নেয়া বাধ্যতামূলক, প্রত্যেকবার। সম্মতি এর মধ্যে কোন অস্পষ্টতা নেই। জোরপূর্বক কখনোই সম্মতি আদায় করা সম্ভব নয়। জোরপূর্বক যদি কেউ সম্মতি প্রদান করে, তবে তা প্রকৃতপক্ষে অসম্মতিকেই ইঙ্গিত করে।
আলোচনা শেষে সংগঠকদের নিয়ে রেলি বের করা হয় । ফরেস্টার বাড়ি, চৌমাথা বাজার, চৌমাথা লেকের পাড়ে জনগণের মাঝে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে লিফলেট বিতরণ ও আলোচনা করা হয়।