বিশ্বব্যাপী হৃদরোগ ঝুঁকি হ্রাস করতে ২০২৩ সালের মধ্যে বিশ্ব খাদ্য সরবরাহ থেকে শিল্পোৎপাদিত ট্রান্সফ্যাট নির্মূল করতে আহ্বান করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ২০২০ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে ট্রান্সফ্যাট-ঘটিত হৃদরোগজনিত মৃত্যু ঝুঁকি সবচেয়ে বেশী বিশ্বের ১৫টি দেশে যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম এবং বাংলাদেশের ৪.৪১% হৃদরোগজনিত মৃত্যুর জন্য দায়ী খাদ্যের ট্রান্সফ্যাট। ট্রান্সফ্যাট-ঘটিত হৃদরোগ ও হৃদরোগজনিত মৃত্যু ঝুঁকি থেকে উত্তরণের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সুপারিশ করেছে খাদ্যদ্রব্যে শিল্পোৎপাদিত ট্রান্সফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা ২ শতাংশে নির্ধারণ করতে অথবা/এবং পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড অয়েল বা পিএইচও এর উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে।
ট্রান্সফ্যাট মুক্ত খাবার নিশ্চিত করতে সবধরনের ফ্যাট, তেল এবং খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্সফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা মোট ফ্যাটের ২ শতাংশ নির্ধারণ করে ২০২১ সালের ২৯ নভেম্বর তারিখে “খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্স ফ্যাটি এসিড নিয়ন্ত্রণ প্রবিধানমালা, ২০২১” সরকারী গেজেটে প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। এই বিধি অনুযায়ী খাদ্যদ্রব্যে ২ শতাংশের বেশি ট্রান্সফ্যাট পাওয়া গেলে নিরাপদ খাদ্য আইন লঙ্ঘন হবে বলে গণ্য হবে যার শাস্তি সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড বা ৩ থেকে ৬ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড।
খাদ্যে শিল্পোৎপাদিত ট্রান্সফ্যাটের প্রধান উৎস পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড অয়েল (পিএইচও), যা ডালডা বা বনস্পতি ঘি নামেই পরিচিত। সাধারণত বেকারি পণ্য, প্রক্রিয়াজাত ও ভাজা পোড়া স্ন্যাক্স এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ ও সড়কসংলগ্ন দোকানে খাবার তৈরিতে পিএইচও বা ডালডা ব্যবহৃত হয়। ২০১৯ সালে পরিচালিত একটি গবেষণায় ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষকদল ঢাকার শীর্ষস্থানীয় পিএইচও (পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড অয়েল) ব্র্যান্ডসমূহের নমুনার ৯২ শতাংশে ডব্লিউএইচও সুপারিশকৃত ২% মাত্রার চেয়ে বেশি ট্রান্সফ্যাট (ট্রান্স ফ্যাটি এসিড) এর উপস্থিতি পেয়েছেন।
“খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্স ফ্যাটি এসিড নিয়ন্ত্রণ প্রবিধানমালা, ২০২১” সম্পর্কে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি) ও ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক টেকনিক্যাল কমিটির সভাপতি মঞ্জুর মোর্শেদ আহমেদ বলেন, “তিন চার মাস আগে আমরা ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণ প্রবিধানমালা প্রকাশ করেছি। আমাদের যা কিছু করণীয় তা আমরা আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই করে ফেলবো। সেইসঙ্গে ট্রান্স ফ্যাট নিয়ন্ত্রণে আমরা একটি রোড ম্যাপও করে দিয়েছি যেখানে সংশ্লিটদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে। ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বরের পরে আর মাত্রাতিরিক্ত ট্রান্সফ্যাট ব্যবহারের সুযোগ থাকছে না। এই সময়ের পর থেকে প্রবিধানমালা বাস্তবায়ন করার বিষয়ে বনস্পতি (ডালডা) উৎপদনকারি কোম্পানিগুলো ভালোভাবেই জানে। যারা বনস্পতি উৎপাদনে ট্রান্স ফ্যাটের মাত্রা ২ শতাংশের নিচে রাখতে পারবে তারা প্রবিধানমালা অনুযায়ী চলবে। যারা পারবে না তারা নন-কমপ্লায়ান্ট হিসেবে গণ্য হবে। আমরা শিল্পোদ্যোক্তাদের সহায়তা করতে চাই কিন্তু আমরা যে তাদের সব কিছু করে দিবো সেটাও নয়। ব্যবসায়ীদের যদি কোনো চাওয়া পাওয়া থাকে তা সরকারের কাছে দাবি করতে পারে। ”
মানব স্বাস্থ্যের জন্য বিষাক্ত এবং অযাচিত এক খাদ্য উপাদান ট্রান্স ফ্যাটি এসিড (টিএফএ) বা ট্রান্সফ্যাট। মূলত ট্রান্সফ্যাট হচ্ছে খাদ্যের এক প্রকার ডায়েটারি ফ্যাট বা স্নেহ জাতীয় খাদ্য উপাদান যার স্বাস্থ্য ক্ষতি বহুমুখী। খাদ্যের সাথে ট্রান্সফ্যাট গ্রহণের ফলে রক্তের এলডিএল বা “খারাপ কোলেস্টেরল” বৃদ্ধি পায়, অপরদিকে এইচডিএল বা “ভালো কোলেস্টেরল”-এর মাত্রা কমে যায়। অতিরিক্ত ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণের ফলস্বরূপ রক্তবাহী ধমনিতে খারাপ কোলেস্টেরল জমা হয়ে রক্তচলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। মাত্রাতিরক্ত ট্রান্সফ্যাট গ্রহণের ফলে হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক, হৃদরোগজনিত মৃত্যু, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, স্তন ক্যান্সার, প্রোস্টেট ক্যান্সার, স্মৃতিভ্রংশ (ডিমেনশিয়া), স্বল্প স্মৃতিহানি (কগনিটিভ ইমপেয়ারমেন্ট), জাতীয় রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে যে রাগ, মানসিক চাপ, আক্রমণাত্মক ব্যবহার, খিটখিটে ও বিরক্ত লাগা, এমনকি বয়ঃসন্ধিকালে ডিপ্রেশনে ভোগার আশঙ্কাও বাড়িয়ে তোলে খাবারের মাঝে লুকিয়ে থাকা ট্রান্সফ্যাট। এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে যে বাংলাদেশে ২০১৯ সালে ১২ হাজার মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে শুধুমাত্র ট্রান্সফ্যাট যুক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে।