পরিবহন খরচ বৃদ্ধিতে আশানুরূপ মূল্যবঞ্চিত চাষীরা
মাটি ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় চলতি মৌসুমে ভোলায় তরমুজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। জেলার সাত উপজেলায় তরমুজের অধিক ফলন হয়েছে। গত বছর দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে তরমুজ চাষে লোকসান হলেও চলতি মৌসুমে বাম্পার ফলনে সে লোকসান কাটিয়ে নেয়ার প্রত্যাশা চাষীদের। তাছাড়া রমজানে তরমুজ বিক্রি করে ভালো মুনাফারও স্বপ্ন দেখছেন তারা। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় তরমুজ বিক্রিতে আশানুরূপ দাম পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রান্তিক চাষীরা।
কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে জেলার সাত উপজেলায় তরমুজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ হাজার ৬১৮ হেক্টর, বিপরীতে আবাদ হয়েছে ১১ হাজার ২৪৯ হেক্টর জমিতে। যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৮৪ হাজার ৯৪৮ টন।
গত মৌসুমে জেলার সাত উপজেলায় তরমুজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১২ হাজার হেক্টর। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও ঝড়-বৃষ্টির কারণে লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয়েছিল ৫ হাজার ৬১৮ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ৫০ হাজার টন।
জেলার উৎপাদিত তরমুজের মধ্যে ৯০ ভাগই চরফ্যাশন উপজেলা থেকে আসে। প্রতি বছরের মতো চলতি মৌসুমেও চরফ্যাশন উপজেলায় তরমুজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ৪ হাজার ৮৫০ হেক্টর ধরা হলেও চাষাবাদ হয়েছে ১০ হাজার ৫৩০ হেক্টর জমিতে। সেখানকার ২১টি ইউনিয়নের মধ্যে নুরাবাদ, মজিবনগর, চরকলমী, আহম্মদপুর, নীলকমল, আবুবক্করপুর, সসুলপুরসহ আট ইউনিয়নে বেশি তরমুজের আবাদ করা হয়েছে। প্রতিটি খেতেই তরমুজের বাম্পার ফলন হয়েছে। রমজানে বাজারে দাম বেশি থাকলেও পরিবহন খরচ বাড়ার কারণে কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না প্রান্তিক চাষীরা। তারা বলছেন, গত বছর তরমুজ চাষে অধিক ফলন পেলেও বাজারে দাম কম থাকায় তাদের অনেক লোকসান গুনতে হয়েছে। এ বছর তরমুজের বাম্পার ফলন হলেও জ্বালানি তেলের দামের কারণে পরিবহন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। ফলে ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে চরম হতাশা ব্যক্ত করেছেন চাষীরা।
উপজেলার নীলকমল ইউনিয়নের তরমুজ চাষী সালাউদ্দিন মিয়া বলেন, চার একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। এতে আমার ৬ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৯ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করেছি। আরো ২ লাখ টাকার তরমুজ খেতে রয়েছে। পরিবহন খরচ কিছুটা কম হলে আরো বেশি মুনাফা করা যেত। আবদুল্যাপুরের ৫নং ওয়ার্ডের তরমুজচাষী শাজাহান বলেন, গত বছর তরমুজ আবাদ করে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও ঝড়বৃষ্টির কারণে অনেক লোকসান দিয়েছি। কিন্তু এ বছর আবহাওয়া এখন পর্যন্ত অনুকূলে থাকায় তরমুজের বাম্পার ফলন পেয়েছি। তিন একর জমিতে তরমুজ চাষ করে ঢাকার এক পাইকারের কাছে পুরো খেত বিক্রি করে দিয়েছি। এতে খরচ বাদ দিয়ে মোটের ওপর আড়াই লাখ টাকা লাভ করতে পেরেছি। রমজান মাস চলমান থাকায় দাম একটু বেশিই পেয়েছি। গত বছরের মতো ডিজেলের দাম কম থাকলে লাভের পরিমাণ আরো বেশি হতো।
ঢাকার কারওয়ান বাজার থেকে তরমুজ ক্রয় করতে আসা জহিরুল ইসলাম নামের এক পাইকারের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, তারা চাষীদের কাছ থেকে খেতজুড়ে তরমুজ ক্রয় করে তা ট্রাকযোগে ঢাকার আড়তে নিয়ে বিক্রি করেন। এতে করে ১০-১২ কেজি ওজনের একটি তরমুজের মূল্য নির্ধারিত হয় ১৮০-২০০ টাকা। মোকামে নেয়ার পর তার দাম বেড়ে ৪৫০-৫০০ টাকা হয়ে যায়। কেননা, চরফ্যাশন থেকে তরমুজ ঢাকা নিতে গত বছর যে ট্রাক ভাড়া করেছি ২০-২৫ হাজার টাকায়। বর্তমানে সেই ট্রাক ভাড়া করতে হচ্ছে ৬০-৭০ হাজার টাকায়। একদিকে যেমন ডিজেলের দাম বেড়েছে, তেমনি দ্বীপজেলা ভোলা থেকে অন্য জেলায় ফেরিযোগে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসা-যাওয়ার পথেও ৭-৮ হাজার টাকা ভাড়া গুনতে হচ্ছে। এতে মাঠ পর্যায়ের সবচেয়ে বড় আকৃতির তরমুজটি ২০০ টাকায় ক্রয় করে মোকামে বিক্রি করতে হচ্ছে ৫০০-৬৫০ টাকা। তাছাড়া রমজান উপলক্ষে বাজারে দাম অনেক বেড়েছে।
এ ব্যাপারে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. হাসান ওয়ারিসুল কবীর বলেন, এবার ভোলায় প্রায় সাড়ে ১১ হাজার হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড়ে ফলন হয়েছে ৫২ টন। এক কথায় বলা যায়, অনেকটা বাম্পার ফলন। এখানকার তরমুজ সারা দেশে জনপ্রিয়। এখান থেকে ফেরি, লঞ্চ ও ট্রলারে করে বিপুল পরিমাণ তরমুজ দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়। ভোলা থেকে দেশের অন্য জেলায় সড়ক পথে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকলে পরিবহন খরচ আরো কমে আসত। এতে তরমুজ চাষীরা আরো বেশি লাভের মুখ দেখতেন।