মাসুদ রেজা ফয়সাল
বামনা(বরগুনা) প্রতিনিধিঃ
বরগুনার বামনা উপজেলার গোলাঘাটা গ্রামের পিতৃ-মাতৃহীন অসহায় তিন বোন রুবি, জেসমিন আর রোজিনারা পেল পুলিশের দেয়া উপহারের ঘর। বাবা-মা আর একমাত্র উপার্জনক্ষম ভাইকে হারিয়ে হয়ে যায় স্বজন হারা। বোনদের লেখাপড়া আর ভরন পোশন করতে বড় বোন রুবি আক্তার(৩০) হয়ে যায় দিশেহারা। ছোট বোনদের এক নিকট আত্মীয়র বাসায় রেখে তিনি পাড়ি দেয় চট্টগ্রামে। কাজ নেন একটি পোশাক কারখানায়। এই ফাঁকে তাঁর কয়েকজন নিকট আত্মীয়রা দখল করে নেন তাদের পৈত্রিক সকল সম্পত্তি। সম্পত্তি উদ্ধারে বিভিন্ন জনের কাছে ধর্না দিলেও কোন সুরাহা পায়নি রুবি ও তাঁর বোনেরা। বছরের পর বছর নিজেদের জমি দখলে নিতে না পারায় তাদের থাকতে হয় অন্যের বাড়িতে আশ্রিতা হয়ে। এই ঘটনাটি বরগুনার বামনা উপজেলার রামনা ইউনিয়নের গোলাঘাটা গ্রামের।
অসহায় ওই তিন বোন নিজেদের সম্পত্তি ফিরে পেতে গত ২৩ ফেব্রুয়ারী বরগুনা জেলা প্রশাসকের অফিসের সামনে অবস্থান নেন মানববন্ধন কর্মসূচিতে। পরে বরগুনা পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর মল্লিকের আশ্বাসে ফিরে আসেন নিজ ভুমিতে। পুলিশের সহায়তায় ফিরে পায় পৈত্রিক ভিটা। পুলিশের অর্থায়নে সেই ভিটায় ওই তিন বোনের মাথা গোঁজার জন্য নির্মান করে দেওয়া হয় একটি সেমি পাকা বাড়ি। জমি ফিরে পাওয়া ও নতুন বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা হওয়ায় খুশি ওই তিন বোন।
জানাগেছে, গোলাঘাটা গ্রামের দিন মজুর আ. রশিদ হাওলাদার ২০০৩ সালে বার্ধাক্যজনিত রোগে মারা যান। এর পরে একমাত্র উপর্যানক্ষম ভাই আলআমীন ২০১৪ সালে ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। ভাই মারা যাওয়ার তিন বছরের মাথায় মারা যায় মা। স্বজনদের হারিয়ে অসহায় হয়ে পরে তিন বোন রুবি আক্তার(৩০), জেসমিন আক্তার(২১) ও রোজিনা আক্তার (১৮)। ছোট দুই বোনদের লেখাপড়া আর সংসারের খরচ মেটাতে রুবি পাড়ি জমায় চট্টগ্রামে। সেখানে একটি পোশাক কারখানায় চাকরি নিয়ে বোনদের বাড়িতে এক নিকট আত্মীয়র বাসায় রেখে পড়াশোনা চালায়। এর ফাঁকে তার কিছু স্বজন তাদের পৈত্রিক সম্পত্তি দখল করে নেয়। রুবি বাড়িতে আসলে নিজের জমিতে যেতে পারতোনা। খুন-জখম ও হত্যার ভয়ভীতি প্রদর্শন করতো তারা। জমি উদ্ধারে স্থানীয় চেয়ারম্যান, ওসি সহ বিভিন্ন স্থানে ধর্না দিলেও তাদের আর্তনাদ কারো কানে পৌছায়নি তখন। পরে উপায় না পেয়ে গত বছর ১৪ জানুয়ারী বামনা উপজেলা পরিষদ ভবনের সামনে জমি ফিরে পেতে অনশনে বসেন তিন বোন। তাদের অনশনের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে পুলিশ তখন তাদের জমি জমার ব্যাপারে খোজ খবর নিতে শুরু করেন। সেটিও ছিলো একদম ধীর গতি। পরে গত ২৩ ফেব্রুয়ারী ওই তিন বোন অবস্থান নেন বরগুনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে। কাফনের কাপড় বেঁধে শুরু করেন অনশন। তাদের অনশনের খবর পেয়ে সেখানে আসেন বরগুনা জেলা পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর মল্লিক। তিনি জমি ফিরিয়ে দেওয়ার আস্বাসে দিলে তারা অনশন ভাঙ্গেন। ওইদিন পুলিশ সুপার তাদের সাথে নিয়ে আসেন গোলাঘাটা গ্রামের বাড়িতে। দখলদার ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে তাদের জমিতে তুলে দেন। এছারাও পুলিশ সুপার তাদের একটি ঘর করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাদের জমিতে একটি টিন সেট পাকা ঘর নির্মান করে দেয় পুলিশ।
আজ সোমবার (২৩ মে) বিকালে বরিশাল বিভাগীয় উপ মহা পুলিশ পরিদর্শক(ডিআইজি) এস এম আখতারুজ্জামান গোলাঘাটা গ্রামে এসে ওই তিন বোনর জন্য নির্মিত বাড়িটি হস্তান্তর করেন। এছারা পুলিশের পক্ষে ওই তিন অসহায় বোনের অর্থ নৈতিক সমস্যা দুর করতে একটি দোকান ঘরের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। এসময় উপস্থিত ছিলেন, জেলা পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর মল্লিক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. তোফায়েল হোসেন সরকার, বামনা থানার অফিসার ইন চার্জ মো. বশিরুল আলমসহ স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তিরা।
ঘর পাওয়ার পর বড় বোন রুবি আক্তার আবেগ আপ্লুত হয়ে বলেন, আমরা নানান স্থানে ঘুরেও আমাদের জমি জমা ফিরে পাইনি। বরিশাল বিভাগীয় পুলিশ কমিশনার, পুলিশ সুপার এবং বামনা থানার অফিসার ইনচার্জ এর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আমি আমার জমি ও একটি ঘর পেয়েছি। পুলিশরা এমন মানবিক আমি কখনো ভাবিনি। এই ঋণ আমি কখনো শোধ করতে পারবো না।
বরিশাল বিভাগীয় উপ মহা পুলিশ পরিদর্শক(ডিআইজি) এস এম আখতারুজ্জামান বলেন, আমরা যখন শুনেছি তিন বোনের অসাহায়ত্বের কথা তখন আমরা তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। আমরা ভাই হিসাবে তাদের পাশে রয়েছি। পুলিশ সবসময় এই অসহায় বোনদের পাশে থাকবে। আমরা একটি ঘর তৈরী করে বোনদের দিয়েছি। আপনারা সবাই ওদের পাশে থাকবেন ওদের দেখে রাখবেন।