সেলিনা আক্তার
’ডিজিটাল বাংলাদেশ’ একটি প্রত্যয়, ২০২১ সালে স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশ ’ডিজিটাল বাংলাদেশে’ পরিণত হবে এই স্বপ্ন রূপায়ণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বর্তমান সরকার। একটি উন্নত দেশ, সমৃদ্ধ ডিজিটাল সমাজ, একটি ডিজিটাল যুগের জনগোষ্ঠি , রূপান্তরিত উৎপাদন ব্যবস্থা, নতুন জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি সব মিলিয়ে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ’ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বস্তুত জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রথম সোপান। গত এক দশকে সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নে বেশকিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা ছিল অপ্রতুল। কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারি শুরুর পর থেকে সেই ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের রূপরেখা ব্যাপক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একটি স্বতঃস্ফূর্ত প্রক্রিয়ায় বাস্তব রূপ লাভ করে চলেছে। করোনার প্রথম পর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্বিধা বা ভীতি সঞ্চার করলেও, খুব দ্রুতই তা সহজ ও সাবলীলভাবে গ্রহণ করেছিল শিক্ষক শিক্ষার্থী সবাই। অভাবনীয় উজ্জ্বল এক ভবিষ্যতের সম্ভাবনা তৈরি করেছে তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর এ শিক্ষা ব্যবস্থা। বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে প্রযুক্তির উন্নত শিখরে। প্রযুক্তিকে গ্রহণ করে মাতৃভাষার মমত্ব ধারণ করেই-বাঙালিত্বের শক্তিমত্তায় নিজেকে বিশ্বনাগরিক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা সময়ের দাবি। প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের ভবিষ্যত প্রযন্মের কাছে নবদিগন্তের দ্বার উন্মোচন করেছে। সংবাদ, তথ্য, যোগাযোগ, কেনাকাটা, ব্যবসা-বানিজ্য, সোশ্যাল নেটওয়ার্ক, বিনোদন ইত্যাদি অনেক কিছুর জন্য মানুষ এখন ইন্টারনেটের উপর নির্ভরশীল।
কিন্তু একই সাথে কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশু কিশোরদের ইন্টারনেটের উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা এখন ভাবনার বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। ইন্টারনেটের কারণে যদি কারো স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হয় এবং সিগারেট, মদ ও ড্রাগের মত ইন্টারনেটের প্রতি যদি কেউ আসক্ত হয়ে পড়ে তখনই সমস্যা। ইন্টারনেটের অতিরিক্ত ব্যবহার শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয়াবহভাবে আসক্তির জন্ম দিচ্ছে। এখন সশরীরে শিক্ষা কার্যক্রম চালু হওয়া সত্তেও ইন্টারনেট আসক্তির কারণে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে মনোযোগ হারাচ্ছেন। বেশ কয়েকজন অভিভাবক একটি বিষয়ে তাঁদের উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন। তা হচ্ছে, করোনাকালীন শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় ধরে ইন্টারনেট ব্যবহারজনিত আসক্তি।
আজকাল প্রায়ই অভিভাবকরা আমাদের কাছে এসে শিক্ষার্থীদের মোবাইল এবং ইন্টারনেট আসক্তির কথা জানান। তারা তাদের সন্তানদের নিয়ে যে সকল সমস্যায় পড়ছেন বলে জানিয়েছেন সেগুলো হলো-
১। পড়তে বললে মোবাইল এবং ইন্টারনেট ছাড়া পড়া যায়না বলে বায়না করে।
২। অনলাইনে বসলে সময়ের জ্ঞান থাকে না।
৩। নেটে বসার জন্যে ঘুম, পড়া, খাওয়াসহ যে কোন কিছু বিসর্জন দিতে পারে।
৪। এ সময়ে কোন কাজ করতে বললে ক্ষেপে যায়।
৫। সব সময় একা থাকতে পছন্দ করে
৬। বন্ধু-বান্ধব, এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথে দূরত্ব সৃষ্টি করে।
৭। বাসায় মেহমান এলে বিরক্ত হয়।
৮। নেটে বসতে না দিলে ক্ষিপ্ত হয়ে ভাংচুর করে।
৯। হোমওয়ার্কের বদলে নেটে বসাকে গুরুত্ব দেয়।
১০। কারনে অকারনে মিথ্যে বলে।
১১। নতুন নতুন অনলাইন বন্ধু তৈরি করে এবং তাদের সাথে পরিবারের সকল তথ্য শেয়ার করে।
১২। অশ্লীল ভিডিও দেখে এবং সেগুলো বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে।
১৩। পুরোনো শখগুলোর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
১৪। দিনে অনেক বার ই-মেইল চেক করে।
১৫। মাঝে মধ্যে ভীষন রকম বিষন্নতাও দেখা যায়।
১৬। কখনো কখনো ভয় পেতে দেখা যায়।
১৭। টাকার প্রতি আগ্রহ বেড়ে যাওয়ায় টাকা চুরি করে।
ইন্টারনেট আসক্তির পরিণাম-
ইন্টারনেট আসক্তি শিশুদের শারীরিক অক্ষমতার কারণও হতে পারে। ইন্টারনেট এমন একটি গ্লোবাল সিস্টেম যেখানে এর ব্যবহারকারীদের কোনো শারীরিক বা কায়িক পরিশ্রম করার দরকার পড়ে না। তাই যে মানুষ বেশি সময় ইন্টারনেট ব্যবহার করে সে তুলনামূলকভাবে খেলাধুলা, ব্যায়ামের মতো শারীরিক কার্যক্রম কম করে থাকে। আর এভাবে ইন্টারনেটের অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষকে শারীরিক অক্ষমতার দিকে নিয়ে যায়। মাথা নিচু করে স্মার্টফোনে ইন্টারনেট ব্রাউজিং করার কারনে মানুষের ঘাড়ের ওপর চাপের সৃষ্টি করে যা পরে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সৃষ্টি করে। স্মার্টফোন এবং ট্যাব নিয়ে বেশি সময় কাটানো বাচ্চারা অন্যদের তুলনায় কম ঘুমায়। দিনে এক ঘণ্টা মোবাইল ফোন ও ট্যাবের টাচস্ক্রিন নিয়ে নাড়াচাড়ার কারণে নিত্যকার অন্তত ১৫ মিনিটের ঘুম কমে যায় বাচ্চাদের। গবেষকরা বলছেন, এসব ডিভাইস থেকে নীল রঙের এক ধরনের আলো বিচ্ছুরিত হয়, যা মানুষের ঘুমানোর ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। মূলত এ কারণেই ঘুম কমে যায় বাচ্চাদের। সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের নতুন এক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উঠে এসেছে এ তথ্য। তিন বছরের কম বয়সী ৭১৫ বাচ্চার মা-বাবার ওপর গবেষণা চালানো হয়। দেখা যায়, বাচ্চারা রাতে কম ঘুমায় কিন্তু দিনে তা পুষিয়ে নেয়। ভারতের এইচওডি সাইক্রিয়াট্রি অ্যান্ড চিফ ন্যাশনাল ড্রাগ ডিপেনডেন্স ট্রিটমেন্ট সেন্টারের (এনডিডিটিসি) বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোর ও যুবকদের মোবাইল ফোন ও কম্পিউটারে আসক্তি বাড়ছে। তা থেকে তারা মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে। অসুস্থ মানসিকতা শিশু কিশোরদের নানান রকম অপরাধমূলক কাজের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইন্টারনেটের এই সময়ে এসে সাইবার অপরাধ জটিল এক মনস্তাত্ত্বিক ব্যধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার শিকার হচ্ছে সব বয়সের মানুষ। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সাইবার বুলিং। ইন্টারনেট ব্যবহার করে একে অপরের গোপন তথ্য ফাঁস করে হুমকি দিচ্ছে। ইন্টারনেট কেন্দ্রিক এ ধরনরের কর্মকাণ্ডকে সাইবার বুলিং বলা যায়। শুধু নারী এবং কিশোর কিশোরীরা নয়, এ সময়ে শিশুরাও ব্যাপক হারে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন বলে জানা যায়। অনেকেই ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তারা সাইবার অপরাধীদের শিকারে পরিণত হচ্ছেন। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা আর অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণে কিশোর-কিশোরীদের সাইবার অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে।
আমাদের শিশু কিশোরদের নিরাপদ জীবন দেয়া আমাদের সকলের দায়িত্ব । এ ভয়াবহ সমস্যার সমাধান করার জন্য দরকার পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক সহযোগিতামূলক সদিচ্ছা। শিশু-কিশোরদের মোবাইল ও ইন্টারনেটের আসক্তি থেকে দূরে রাখতে হলে মা-বাবাসহ পরিবারের বড় সদস্যদের মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে।
সুপারিশ সমূহঃ
১। ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে পারিবারিক শৃঙ্খলা, সঠিক নৈতিক শিক্ষা, ধর্মীয় শিক্ষা, শিশুদের সুস্থ বিনোদন, উম্মুক্ত মাঠে খেলাধুলার সুযোগ করে দিতে হবে।
২। কঠোর শাসন, মারধর কিংবা কম্পিউটার-মোবাইল ব্যবহারে বাঁধা না দিয়ে তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করে তাদের কাছে টেনে নিতে হবে যাতে তারা বুঝতে পারে বাবা-মা ই তাদের সব থেকে ভালো বন্ধু।
৩। বাবা-মায়ের উচিত ইন্টারনেট ব্যবহার বিষয়ে সন্তানের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলা। অবাধ ইন্টারনেট ব্যবহারের ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত করা।
৪। বাবা-মায়ের স্মার্ট ফোনটি কিছু সময়ের জন্য কাছে বসে ব্যবহারের সুযোগ দেয়া।
৫। মাঝে মাঝে ভালো কাজের শর্তে অফলাইন গেম খেলার সুযোগ দেয়া।
৬। তাদের সাথে ইনডোর আউটডোর গেম খেলা।
৭। সাইবার বুলিং এর শিকার হবার আগেই এ সম্পর্কে শিশুদের সচেতন করা। যাতে যে কোনো সমস্যায় পড়লে সমাধানের জন্য বাবা-মাকেই নির্ভরযোগ্য বলে মনে করে।
৮। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ আশ্রয় স্থল বানাতে হবে।
৯। শিক্ষকদের শিক্ষার্থীদের সাথে ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
১০। শিক্ষার্থীরা তাদের যে কোনো সমস্যা নির্দ্বিধায় শিক্ষকদের কাছে বলতে পারে সেরকম সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
১১। শ্রেণি কক্ষকে শিক্ষার্থীবান্ধব করতে হবে।
১২। পাঠদান কার্যক্রমকে অনেক বেশী আকর্ষনীয় করে তুলতে হবে।
১৩। প্রতিষ্ঠানে সহশিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখতে হবে এবং সকল শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহন করার সুযোগ করে দিতে হবে।
১৪। সর্বপরি গণসচেতনতা বৃদ্ধিতে দেশের সকল সচেতন মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে।
একটা সময় ছেলেমেয়েদের শৈশব শুরু হতো বাড়ির উঠোনে। শিশু একটু বড় হলেই ব্যাট-বল নিয়ে দাপিয়ে বেড়াত মাঠঘাট। গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা, ডাংগুলি, লাটিম, মার্বেলসহ কত ধরনের খেলাধুলায় মেতে থাকত শিশু। শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের কোলাহলে মুখর হয়ে উঠত সেসব মাঠ। ছোট ছোট আনন্দ রাঙিয়ে যেত শৈশব। বর্তমানে সোনালি অতীতের সেসব খেলাধুলার কথা যেন কল্পনাই করা যায় না। বিশেষ করে শহরের শিশুদের জীবন যেন চার দেয়ালে বন্দি। শিশুর বুদ্ধি বিকাশের সোনালি সময়টুকু কেড়ে নিচ্ছে বিভিন্ন স্মার্ট ডিভাইস আর ইন্টারনেট। ইন্টারনেটকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা এখন প্রায় অসম্ভব। তাই সচেতন ব্যবহারের দিকে সব থেকে বেশী নজর দিতে হবে।
সবকিছুর পরেও আমরা স্বপ্ন দেখি একটি সুস্থ বিশ্বের, একটি সুস্থ সংস্কৃতির একটি সুস্থ পরিবেশের । স্বপ্ন দেখি আমাদের ভবিষ্যত প্রযন্ম তাদের জ্ঞান ও শিক্ষা দিয়ে বিনির্মান করবে এক আলোকিত বাংলাদেশ।
সেলিনা আক্তার
সহকারি শিক্ষক আইসিটি
সরকারি ডব্লিউ বি ইউনিয়ন মডেল ইনস্টিটিউশন
উজিরপুর, বরিশাল।