দেশের সর্বত্র ট্রান্সফ্যাট মুক্ত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে সবধরনের তেল, চর্বি, এবং খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্সফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা মোট ফ্যাটের ২ শতাংশ নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। কর্তৃপক্ষ এই লক্ষ্যে “খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্স ফ্যাটি এসিড নিয়ন্ত্রণ প্রবিধানমালা, ২০২১” প্রণয়ন করেছে ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে। এই বিধি অনুযায়ী খাদ্যদ্রব্যে ২ শতাংশের বেশি ট্রান্সফ্যাট পাওয়া গেলে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ লঙ্ঘন হবে বলে গণ্য হবে। উক্ত প্রবিধানমালা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। তারই প্রেক্ষিতে আগামীকাল ৫ জুন একটি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে যেখানে আমন্ত্রণ করা হয়েছে দেশের স্বনামধন্য খাদ্যপ্রস্তুতকারক কোম্পানিসহ বিভিন্ন বেকারি ও কনফেকশনারি মালিক সমিতিদের।
“খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্স ফ্যাটি এসিড নিয়ন্ত্রণ প্রবিধানমালা, ২০২১” সম্পর্কে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি) ও ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক টেকনিক্যাল কমিটির সভাপতি মঞ্জুর মোর্শেদ আহমেদ বলেন, “আমরা এ বছরের মধ্যেই ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণ প্রবিধানমালা বাস্তবায়নের সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করে ফেলবো। খাদ্যব্যবসায়ীদের যদি কোনো দাবী দাওয়া থাকে তবে তারা নিশ্চয়ই তা সরকারের কাছে পেশ করতে পারবে। কিন্তু ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বরের পর থেকে কোনোক্রমেই আর মাত্রাতিরিক্ত ট্রান্সফ্যাট ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না। এই তারিখের পর থেকে এই প্রবিধানমালা বাস্তবায়ন করার বিষয়ে বনস্পতি উৎপদনকারি কোম্পানিগুলোকে অবহিত করা হয়েছে। যারা বনস্পতিসহ প্রস্তুতকৃত বা বাজারজাতকৃত খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্স ফ্যাটের মাত্রা ২ শতাংশের নিচে রাখতে পারবে তারা প্রবিধানমালা মেনে চলবে। এ বিষয়ে আমরা খাদ্যব্যবসায়ীদের সহায়তা করতে চাই। সেই উদ্দেশ্যেই ৫ জুন আমারা একটি আলোচনা সভার আয়োজন করছি। ট্রান্সফ্যাট মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে খাদ্য ব্যবসায়ীদের আন্তরিক সহযোগিতা ও উদ্যোগ গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন।”
স্বাস্থ্যের জন্য বিষাক্ত এবং অযাচিত এক খাদ্য উপাদান ট্রান্সফ্যাট বা ট্রান্স ফ্যাটি এসিড (টিএফএ)। মূলত ট্রান্সফ্যাট হচ্ছে খাদ্যের এক প্রকার ডায়েটারি ফ্যাট বা স্নেহ জাতীয় খাদ্য উপাদান যার স্বাস্থ্য ক্ষতি বহুমুখী। খাদ্যের সাথে ট্রান্সফ্যাট গ্রহণের ফলে রক্তের এলডিএল বা “খারাপ কোলেস্টেরল” বৃদ্ধি পায়; অপরদিকে এইচডিএল বা “ভালো কোলেস্টেরল”-এর মাত্রা কমে যায়। অতিরিক্ত ট্রান্স ফ্যাট রক্তবাহী ধমনিতে খারাপ কোলেস্টেরল জমা হয়ে রক্তচলাচলে বাধা সৃষ্টি করে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। মাত্রাতিরক্ত ট্রান্সফ্যাট গ্রহণের ফলে হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক, হৃদরোগজনিত মৃত্যু, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, স্তন ক্যান্সার, প্রোস্টেট ক্যান্সার, স্মৃতিভ্রংশ (ডিমেনশিয়া), স্বল্প স্মৃতিহানি (কগনিটিভ ইমপেয়ারমেন্ট), জাতীয় রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে যে রাগ, মানসিক চাপ, আক্রমণাত্মক ব্যবহার, খিটখিটে ও বিরক্ত লাগা, এমনকি বয়ঃসন্ধিকালে ডিপ্রেশনে ভোগার আশঙ্কাও বাড়িয়ে তোলে খাবারের মাঝে লুকিয়ে থাকা ট্রান্সফ্যাট।
খাদ্যে শিল্পোৎপাদিত ট্রান্সফ্যাটের প্রধান উৎস পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড অয়েল (পিএইচও), যা ডালডা বা বনস্পতি ঘি নামেই পরিচিত। সাধারণত বেকারি পণ্য, প্যাকেটজাত প্রক্রিয়াজাত খাবার ও ভাজা পোড়া স্ন্যাক্স এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ ও সড়ক সংলগ্ন দোকানে খাবার তৈরিতে পিএইচও বা ডালডা ব্যবহৃত হয়। ২০১৯ সালে পরিচালিত একটি গবেষণায় ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষকদল ঢাকার শীর্ষস্থানীয় পিএইচও (পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড অয়েল) ব্র্যান্ডসমূহের নমুনার ৯২ শতাংশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সুপারিশকৃত সর্বোচ্চ ২% মাত্রার চেয়ে বেশি ট্রান্সফ্যাট (ট্রান্স ফ্যাটি এসিড) এর উপস্থিতি পেয়েছেন।
বিশ্বব্যাপী হৃদরোগ ঝুঁকি হ্রাস করতে ২০২৩ সালের মধ্যে বিশ্ব খাদ্য সরবরাহ থেকে শিল্পোৎপাদিত ট্রান্সফ্যাট নির্মূল করতে আহ্বান করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ২০২০ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে বিশ্বের ১৫টি দেশে ট্রান্সফ্যাট-ঘটিত হৃদরোগজনিত মৃত্যু ঝুঁকি সবচেয়ে বেশী যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম এবং বাংলাদেশের ৪.৪১% হৃদরোগজনিত মৃত্যুর জন্য দায়ী খাদ্যে লুকিয়ে থাকা ট্রান্সফ্যাট। ট্রান্সফ্যাট-ঘটিত হৃদরোগ ও হৃদরোগজনিত মৃত্যু ঝুঁকি থেকে উত্তরণের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সুপারিশ করেছে খাদ্যদ্রব্যে শিল্পোৎপাদিত ট্রান্সফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা ২ শতাংশ নির্ধারণ করতে অথবা/এবং পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড অয়েল বা পিএইচও এর উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে। এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে যে বাংলাদেশে ২০১৯ সালে শুধুমাত্র ট্রান্সফ্যাট যুক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে ১২ হাজার মানুষ।