• ২৬শে জুন, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ , ১২ই আষাঢ়, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

স্বপ্নের পদ্মা সেতু” অবাক বিশ্ব অবাক, তাকিয়ে রয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত জুন ২৫, ২০২২, ০৪:০১ পূর্বাহ্ণ
স্বপ্নের পদ্মা সেতু” অবাক বিশ্ব অবাক, তাকিয়ে রয়।

মোঃ হুমায়ুন কবির।
স্টাফ রিপোর্টার :

অবশেষে সেই ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণের দোরগোড়ায় বাংলাদেশ। ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে অপেক্ষার পালা আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই আনুষ্ঠানিক ভাবে খুলে দেওয়া হবে স্বপ্নের পদ্মা সেতু। বিশাল ও ব্যয়বহুল এ সেতু নির্মাণ পরিকল্পনার শুরু থেকেই সেতুর স্বপ্ন নস্যাৎ করতে দেশী বিদেশী ষড়যন্ত্র ছিলো আঁতকে ওঠার মতো। দফায় দফায় সেতুর পিলার ক্যাপে ফেরির ধাক্কা ছিলো চোখ কপালে তোলার মতো।
তারপরও সকল বাধা উপেক্ষা করে স্ব মহিমায় উদ্ভাসিত স্বপ্নের পদ্মা সেতু। আর এ নির্মাণযজ্ঞ সফল ভাবে সম্পন্ন হওয়ায় দেশে বিদেশে ইতিমধ্যে বাহবা পেতে শুরু করেছে শেখ হাসিনা সরকার। প্রশংসায় ভাসছে গোটা বাংলাদেশ।
এ সেতু নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অধিষ্ঠিত হলো এক অনন্য উচ্চতায়। যদিও উদ্বোধন অনুষ্ঠান পুরোপুরি নিষ্কন্ঠক কি-না সে সংশয় দেশপ্রেমী জনসাধারণের মধ্যে কিছুটা কী রয়েছেই?
আসলে পদ্মা সেতু শুধু সেতু নয়। এ সেতু যেনো লড়াই সংগ্রাম আর নতুন করে স্বাধিকার অর্জনের এক মহা সংগ্রাম মূখর ইতিহাস। এ সেতু তৈরিতে যে পরিমাণ মেধা পরিশ্রম আর সংগ্রাম করতে হয়েছে, তেমনটি হয়নি হয়তো অনেক দেশের স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রেও। তাই এই সেতু মানে সেতু নয় এটি বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশের প্রতীক। আমাদের লড়াই সংগ্রাম আর হার না মানার মূর্ত স্মারক। তাই পদ্মা সেতু মানেই কোনো ষড়যন্ত্রের কাছে মাথা নত না করার সুদৃঢ় প্রত্যয়, আমাদের অহংকার। আমাদের সক্ষমতার এক জীবন্ত উদহারণ।
শুরুর কথাঃ

পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষ শুরুতে বাংলাদেশের আবদুল মোনেম লিমিটেডকে দুটি সংযোগ সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণের চুক্তি দেয়। সেতুর মূল নির্মাণ কাজ শুরু হয় অক্টোবর ২০১৭ সালে। ৩০ সেপ্টেম্বর দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই সেতুতে পিলারের ওপর বসানো হয় প্রথম স্প্যান।

শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিলারের ওপর ভাসমান ক্রেনের সাহায্যে এই স্প্যান বসানোর মধ্যে দিয়ে শুরু হয় বাঙালি জাতির হার না মানা সুদৃঢ় পথচলা। এ সেতু পানির অংশে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। তবে ডাঙার অংশ ধরলে সেতুটির মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৯ কিলোমিটার। এ সেতুর নির্মাণ ব্যয় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। আর এ সেতুর প্রস্থ ১৮.১০ মিটার (৫৯.৪ ফিট)।

সেতুর গুরুত্বপূর্ণ তথ্যঃ
পদ্মা সেতুর প্রথম স্প্যানটি বসানো হয় ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। সেতুর মোট স্প্যান ৪১ টি। মোট পিলার ৪২ টি। প্রথম স্প্যানটি বসানো হয় ৩৭ ও ৩৮ নম্বর খুটির/পিলারের উপর। এ সেতুর শেষ/৪১ তম স্প্যানটি বসানো ১২ ও ১৩ নম্বর খুটির উপরে। পদ্মা সেতুর মাধ্যমে সংযোগ স্থাপন হবে মোট ২৯ টি জেলার সাথে। যার মধ্যে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পশ্চিমের জেলা রয়েছে ২১ টি। এ সেতুর মোট ৪১ টি স্প্যান বসাতে সময় লাগে ৩ বছর ২ মাস ১০ দিন।
সর্ব শেষ বা ৪১ তম স্প্যান বসানো হয় ১০ ডিসেম্বর ২০২০ সালে। সেতুতে ব্যবহৃত প্রতিটি স্প্যানের দৈর্ঘ্য ১৫০ মিটার। পদ্মা সেতুর সংযোগকারি স্থানসমূহ মূলতঃ মুন্সিগঞ্জের মাওয়া এবং শরিয়তপুরের জাজিরা। যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে এ সেতু আনুষ্ঠানিক ভাবে খুরে দেওয়া হবে ২৫শে জুন ২০২২ তারিখে।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকঃ
বাংলাদেশের দীর্ঘতম সড়ক সেতু-পদ্মা সেতু। এর আগে দীর্ঘতম সড়ক সেতু ছিলো-যমুনা সেতু।
বাংলাদেশের দীর্ঘতম রেল সেতু -হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। নদীর উপর নির্মিত বিশ্বের প্রথম দীর্ঘতম সেতু-পদ্মা সেতু। পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হয়েছিলো-২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে। এ সেতুর প্রতিটি স্প্যানের ওজন -৩২০০ টন করে। পদ্মা সেতুর শেষ স্প্যান বসানো হয় বিশ্ব মানবাধিকার দিবসে।
পদ্মা সেতুর প্রকল্পের নাম ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প’। পদ্মা সেতুর ধরন দ্বিতলবিশিষ্ট (দোতলা) এটিই পৃধিবীর একমাত্র প্রথম সেতু যা এই কংক্রিট আর স্টিল দিয়ে নির্মিত। পদ্মা সেতু প্রকল্পে মোট ব্যয় (মূল সেতুতে) ৩০ হাজার ৭৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। পদ্মা সেতু নির্মাণে চুক্তিবদ্ধ কোম্পানির নাম চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেড এর আওতাধীন চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানি লিমিটেড নামের একটি প্রসিদ্ধ প্রতিষ্ঠান।

পদ্মা সেতুতে থাকবে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অপটিক্যাল ফাইবার সংযোগ পরিবহন সুবিধা। পদ্মা সেতুতে রেললাইন স্থাপন হচ্ছে স্প্যানের মধ্য দিয়ে। পদ্মা সেতুর প্রস্থ হবে ৭২ ফুট, এতে থাকবে চার লেনের সড়ক। মাঝখানে রোড ডিভাইডার রয়েছে।
স্বপ্নের এ পদ্মা সেতু প্রকল্পে নদীশাসন হয়েছে দুই পাড়ে ১২ কিলোমিটার। পদ্মা সেতু প্রকল্পে কাজ করছে প্রতিদিন প্রায় চার হাজার মানুষ। পানির স্তর থেকে পদ্মা সেতুর উচ্চতা রয়েছে ৬০ ফিট। এ পদ্মা সেতুর পাইলিং গভীরতা ৩৮৩ ফুট। প্রতি পিলারের জন্য পাইলিং হয়েছে ৬টি করে। তবে মাটি জটিলতার কারণে ২২টি পিলারের পাইলিং করা হয়েছে ৭টি।

খরচ উঠতে কতদিন লাগবেঃ
পদ্মা সেতুর খরচ উঠতে কত বছর সময় লাগতে পারে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। তিনি বলেন, পদ্মা সেতুর টাকা সেতু কর্তৃপক্ষকে ১ শতাংশ হার সুদে সরকারকে ফেরত দিতে হবে।
ফিজিবিলিটি স্টাডিতে যেমন ছিল যে, ২৪ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে টাকাটা (নির্মাণ ব্যয়) উঠে আসবে। এখন মনে হচ্ছে ১৬ থেকে ১৭ বছরের মধ্যেই টাকাটা উঠে আসবে। কারণ মোংলা পোর্ট যে এত শক্তিশালি হবে, পায়রা বন্দর হবে, এত শিল্পায়ন হবে সেগুলো কিন্তু ফিজিবিলিটি স্টাডিতে আসেনি। তিনি আরও বলেন, ধারণা ছিল পদ্মা সেতু ১ দশমিক ৩ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি আনবে।
এখন দেখা যাচ্ছে, এটা আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ২ এর কাছাকাছি চলে যাবে। তবে আমজনতা মনে করছে আরও আগেই পদ্মা সেতুর খরচের টাকা উঠে আসবে।

কতোটা শক্তিশালি এই সেতুঃ
সেতু বিশেষজ্ঞরা বলছেন পদ্মা সেতুর রেলপথ যদি পূর্ণ হয়ে যায় ভারি ট্রেনে। ঘটনাক্রমে ওই সময় সড়ক অংশও পণ্যবোঝাই সব লরির সারি যদি সারিবদ্ধ চলতে বা দাঁড়িয়ে থাকে। এমন সময় যদি হঠাৎ করে শুরু হয় ভূমিকম্প।
যেনতেন ভূমিকম্প নয়, রিখটার স্কেলে আট মাত্রার। আর যদি ঐ ভূমিকম্পে সেতুর পিলারের নিচ থেকে মাটি সরে যায় ৬২ মিটার। আর ঠিক ওই ভয়ংকর সময়ে চার হাজার টনের একটি জাহাজ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ধাক্কা দেয় পদ্মা সেতুতে। তারপরও পদ্মা সেতু তখনও ঠাঁয় দাঁড়