পদ্মার বুকে ৪২টি পিলারের উপর দাড়িয়ে ১৭ কোটি মানুষের স্বপ্ন। শত বাঁধা বিপত্তি পেড়িয়ে পদ্মা সেতু এখন যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। এই সেতুর মাধ্যমে যেমন দক্ষিণের ২১ জেলার চেহারা বদলে যাবে, তেমনি পাল্টে যাবে বরিশালের পর্যটন শিল্প। দেশের অন্যতম নৈসর্গিক সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটা, যেখান থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়। সেই সৈকত থেকে শুরু করে সমুদ্র বন্দর পায়রা, শেরে বাংলার জন্মভুমি এবং অপার সৌন্দর্য্যের বিস্তির্ন উপক‚ল। প্রচুর সম্ভাবনা আর ইতিহাস ঐতিহ্যে ভরপুর এরকম অসংখ্য স্থাপনা রয়েছে এই দক্ষিনে।জানা গেছে, রাজধানী ঢাকা থেকে সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারের দুরত্ব প্রায় ৫শ’ কিলোমিটার। এক্ষেত্রে মাত্র ২৬৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থান কুয়াকাটার। এতো কাছে থেকেও কুয়াকাটা পর্যটকদের মনোযোগ কাড়তে পারেনি কেবল পদ্মা নদীর কারণে। শুধু কুয়াকাটাই নয়, এই অঞ্চলে রয়েছে ঝালকাঠি, পিরোজপুর ও বরিশালের বানারীপাড়ার আটঘর-কুড়িয়ানার পেয়ারা বাগান ঘিরে গড়ে উঠেছে পর্যটন কেন্দ্র। বরগুনার তালতলিতে শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত এবং টেংরাগীরি বনাঞ্চল, পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে জাহাজ মারা সৈকত, গলাচিপার কলাগাছিয়া সাগর পাড়, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার হরিনপালা এবং বরগুনার পাথরঘাটার হরিনঘাটা। বরিশালের দূগা সাগর, গুঠিয়া মসজিদ, উজিরপুরের লাল শাপলার রাজ্য সাতলাসহ বিভিন্ন দর্শনিয় স্পট। কুয়াকাটা ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্ট সংক্ষেপে কুটুম’র চেয়ারম্যান নাসিরউদ্দিন বিপ্লব বলেন, ‘পদ্মা আমাদেরকে আলাদা করে রেখেছিল রাজধানী তথা সারা দেশ থেকে। এই নদীর কারনে কুয়াকাটায় বিনিয়োগের গতিও ছিল অত্যন্ত ধীর। এখন পর্যন্ত সৈকত এলাকায় শতাধিক হোটেল মোটেল রেস্তোরা গড়ে উঠলেও তাতে নেই তেমন পেশাদারিত্ব। আমাদের সেই আক্ষেপের দিন ফুরোচ্ছে। পদ্মা সেতু চালু হলে ৫ থেকে ৬ ঘন্টায় রাজধানী থেকে এসে পৌছানো যাবে কুয়াকাটা। কেউ চাইলে দিনে দিনে ঢাকা থেকে এসে ঘুরে যেতে পারবে সমুদ্র সৈকত। এই সুযোগ দিতে পারবো একমাত্র আমরা। ফলে সেতু চালু হলে পাল্টে যাবে চিত্র। পর্যটকদের ভীড়ে গম গম করবে সৈকত। এরইমধ্যে বিপুল বিনিয়োগের আশা নিয়ে এখানে আসতে শুরু করেছে দেশের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং শিল্প গ্রæপগুলো।’বানারীপাড়া বন্দর ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো: মনিরুজ্জামান আশরাফী বলেন, ‘কেবল পর্যটন খাত নয়, পদ্মা সেতু যে কিভাবে দক্ষিনের জীবন মানে উন্নয়ন ঘটাবে তা আমরা এখন কল্পনাও করতে পারছিনা। আমাদের সন্ধ্যা নদীকে নিয়ে অনেক পরিকল্পনা রয়েছে। এই নদীর সৌন্দর্য্যের পাশাপাশি পেয়ারা বাগানকে মানুষের মাঝে তুলে ধরতে প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও আমরা ব্যবসায়ীরা এক সাথে কাজ করে যাচ্ছি। মুলত পদ্মা সেতু চালু হলে পুরো বাংলাদেশ এক সুতোয় যুক্ত হবে।বরিশাল চেম্বার অব কর্মাসের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, ‘ভোলার মনপুরা-চরফ্যাশন থেকে পটুয়াখালীর গলাচিপা-রাঙ্গাবালী হয়ে কুয়াকাটা এবং বরগুনার পাথরঘাটা-তালতলী পর্যন্ত পুরো উপকূলীয় এলাকা জুড়ে একটি এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন করার চিন্তা-ভাবনা চলছে সরকারের। পদ্মা সেতুর কারণে এই সম্ভাবনা আরো কয়েকগুন বেড়ে গেছে।ট্রাভেল এজেন্সী হলি ডে এর মালিক কামরুজ্জামান বাসার বলেন, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বরিশাল তথ্য দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটন শিল্পের বৈপ্লবিক বিকাশ ঘটবে। স্বপ্ল সময়ে রাজধানী ঢাকার সাথে বরিশালের যোগাযোগের কারণে দেশ বিদেশের পর্যটকরা বরিশালের কুয়াকাটাসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পটে আসবে। তাই আমরা কুয়াকাটা, সুন্দরবনের একটা অংশ, পেয়ারা বাগান, লাল শাপলার রাজ্য সাতলা, দূগা সাগর ও বিভিন্ন নদ নদীকে কেন্দ্র করে প্যাকেজ তৈরি করছি। এই প্যাকেজগুলোর মাধ্যমে পর্যটকরা পাবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যসহ ন্যাচারাল ফুড ও ফিস। এই সেতুর কারণে দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটন শিল্প পাবে অন্য ধরণের বিকাশ। বরিশালের নদি বেস্টিত এলাকা হিজলা মেহেন্দিগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য পঙ্কজ নাথ বলেন, ‘বিস্তৃত জলরাশিকে কেন্দ্র করে আমরা পর্যটক আকৃষ্ট করার চেস্টা চালাচ্ছি। ভ্রমন পিয়াসু দেশি বিদেশী পর্যটকদের নিয়ে সাজানো হচ্ছে নৌ বিহারের নতুন নতুন প্যাকেজ। হতে পারে লাহারহাট থেকে একটি জাহাজ পর্যটকদের নিয়ে যাত্রা শুরু করবে। মেঘনার অপরূপ সৌন্দর্য্য, ইলিশ আহরনে চিত্র অবলোকন করতে পারবে পর্যটকরা।’ তিনি বলেন, ‘পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটাকে প্রাধান্য দিয়ে পর্যটকদের ৩ থেকে ৪ দিন বরিশালের বিভিন্ন স্পট ঘুরাতে হবে। তাতে করে পর্যটকরা বরিশালকে উপভোগ করতে পারবে। আর দেশের জন্য আসবে বৈদেশিক মুদ্রা। স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালুকে কন্দ্রে করে আমরা এসব প্রস্তুতি গ্রহন করছি।’ এ বিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার আমিন উল আহসান বলেন, সেতুর উদ্বোধনের সাথে সাথে এই অঞ্চলের পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটবে নিঃসন্দেহে। সরকারি ও বেসরকারি ভাবেও আমরা কাজ শুরু করেছি। সম্প্রতি পর্যটন কর্পোরেশনের সচিব ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কুয়াকাটা, পটুয়াখালী ও বরগুনার বিভিন্ন স্পট ঘুরে গেছেন। আমাদের সাথে কথাও বলেছেন। এর আগে কুয়াকাটাসহ পর্যটন শিল্পের মাস্টার প্লান নিয়েও আমরা কর্মশালা করেছি। আমরা দেখছি কিভাবে প্যাকেজ তৈরি করা যায়। পাশাপাশি পর্যালোচনাও করা হচ্ছে। শুধু তাই নয় পর্যটকের নিরাপত্তা, থাকা খাওয়ার কি কি সুযোগ সুবিধা রয়েছে তাও দেখা হচ্ছে। সর্বপরি এই অঞ্চলের পর্যটন শিল্পর ব্যাপর উন্নয়ন ঘটবে বলে আশা রাখি।