স্টাফ রিপোর্টার, গোপালগঞ্জ : গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলা মধুমতি নদীর উপর নব নির্মিত মধুমতি সেতুর শুভ উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ সোমবার দুপুরে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এ সেতুর উদ্বোধন করেন। এ সেতু উদ্বোধন হওয়ায় খুলে গেল যোগাযোগ ও ব্যাবসা বাণিজ্যের নতুন দ্বার। স্বপ্নপুরণ হলো দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে ১০ জেলার মানুষের। এতে ব্যবসা বাণিজ্যোর নতুন দিগন্তের সুচনা হবে এ অঞ্চলে। গড়ে উঠবে শিল্প কলকারখানা। সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থানের। এ সেতুটি চালু করায় খুশি গোপালগঞ্জবাসী। প্রধানমন্ত্রীকে ধণ্যবাদ জানিয়ে দীর্ঘায়ু কামনা করেছেন তারা। আজ সোমবার রাত ১২ টা ১ মিনিট থেকে মধুমতি সেতুতে যানবাহন চলাচল শুরু হবে।
গোপালগঞ্জের সাথে নড়াইলসহ যশোর অঞ্চলকে বিভক্ত করে ছিল কাশিয়ানী উপজেলার কালনা পয়েন্ট মধুমতি নদী। ফলে এ নদী পার হয় চরম ভোগান্তিতে পড়তে হতো সাধারন মানুষকে। ফলে মানুষের ভোগান্তি কমাতে ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সেতুর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সেতুর নির্মাণ কাজের শুভ উদ্বোধন করেন। এরপর দীর্ঘ ৫ বছরের নির্মাণ হয় মধুমতি সেতু।
আজ সোমবার (১০ অক্টোবর) দুপুরে ভার্চুয়াল মাধ্যমে মধুমতি সেতুর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সেতু উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের ১০টি জেলার যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্তের সূচনা হলো। প্রধানমন্ত্রীর সেতু উদ্বোধন অনুষ্ঠানে মধুমতি সেতুর পশ্চিম প্রান্তে নড়াইল ও জেলা প্রশাসকের কারয্যালয়ে যুক্ত ছিল গোপালগঞ্জ জেলা।
গোপালগঞ্জ অংশের অনুষ্ঠানে মহিলা সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য নার্গিস রহমান, জেলা প্রশাসক শাহিদা সুলতানা, পুলিশ সুপার আয়েশা সিদ্দিকী, গোপালগঞ্জ সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. সুরুজ মিয়া, সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী তাপসী দাশ, ক্রস বর্ডার রোড নেটওয়ার্ক ইমগ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট (বাংলাদেশ) এর অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক অাবু হেনা মোস্তফা কামাল, সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি চৌধুরী এমদাদুল হক, সাধারন সম্পাদক মাহাবুব আলী খান, টুঙ্গিপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ আবুল বশার খায়ের, কাশিয়ানী উপজেলা চেয়ারম্যান সুব্রত ঠাকুর, টুঙ্গিপাড়া পৌরসভার মেয়র শেখ তোজাম্মেল হক টুটুলসহ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, প্রশাসনের উর্দ্ধধন কর্মকর্তাবৃন্দ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণ উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে, মধুমতি সেতু উদ্বোধনের আনন্দ জনগনের সাথে ভাগাভাগি করতে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মুহাম্মদ ফারুক খান মধুমতি সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে কাশিয়ানীর ভাটিয়াপাড়া গোল চত্বরে স্থানীয় নেতাকর্মিদের নিয়ে সমাবেশ করেছেন। সমাবেশে কাশিয়ানী উপজেলা আওয়ামী সভাপতি মোক্তার হোসেন, সাধারন সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম, মুকসুদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রবিউল আলম শিকদার, সাধারন সম্পাদক সাহিদুর রহমান টুটুল প্রমূখ বক্তব্য রাখেন।
গত ২৫ জুন পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর যশোর ও নড়াইলসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কাছে কালনা সেতু নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে। পদ্মা সেতু পার হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের প্রবেশদ্বার হবে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার মধুমতী সেতু। এ সেতু নির্মাণের ফলে ঢাকার সাথে ১০ জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হবে। এ সেতুর মাধ্যমে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা-কালনা- নড়াইল-যশোর-বেনাপোল জাতীয় মহাসড়ক তথা এশিয়ান হাইওয়ের সাথে যুক্ত হলো। বাংলাদেশের অন্যতম বহৎ স্থলবন্দর বেনাপোল ও ভোমরা, নওয়াপাড়া নদীবন্দর, যশোর ও নড়াইল জেলা ও ভারতের সাথে ঢাকার দুরত্ব কমবে। এ সেতুর উদ্বোধন হওয়ায় খুশি গোপালগঞ্জবাসী। এখন সহজেই নড়াইল, যশোর, সাতক্ষীরা, বেনাপোলসহ বিভিন্ন জেলায় সহজেই যাতায়েত করতে পারবে। কমে আসলো ১০০ কিলোমিটার পথ।
সেতুটির দৈর্ঘ্য ৬৯০ মিটার এবং প্রস্থ ২৭.১০ মিটার। উভয় পাশে ৬ লেনের সংযোগ সড়ক রয়েছে, যার দৈঘ্য প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার। সেতুর মাঝখানে বসানো হয়েছে ১৫০ মিটার দীর্ঘ একটি স্টিলের স্প্যান। ধনুকের মতো বাঁকা এ স্প্যান তৈরি হয়েছে ভিয়েতনামে। এই স্প্যানের উভয় পাশের অন্য স্প্যানগুলো পিসি গার্ডারের (কংক্রিট)। ছয় লেনের এ সেতু হবে এশিয়ান হাইওয়ের অংশ। চারটি মূল লেনে দ্রুতগতির ও দুটি লেনে কম গতির যানবাহন চলাচল করবে। সেতুতে একটি ৮ লেনের টোল প্লাজা রয়েছে। সেতু নির্মাণে মোট ব্যয় ৯৬০ কোটি টাকা।
সেতুতে পারাপারের জন্য বড় ট্রেইলার ৫৬৫ টাকা, তিন বা ততোধিক এক্সসেল বিশিষ্ট ট্রাক ৪৫০ টাকা, দুই এক্সসেল বিশিষ্ট মাঝারি ট্রাক ২২৫, ছোট ট্রাক ১৭০ টাকা, কৃষি কাজে ব্যবহৃত পাওয়ার ট্রিলার ও ট্রাক্টর ১৩৫ টাকা, বড় বাসের ক্ষেত্রে ২০৫ টাকা, মিনিবাস বা কোস্টার ১১৫ টাকা, মাইক্রোবাস, পিকাপ, কনভারশনকৃত জিপ ও রে-কার ৯০ টাকা, প্রাইভেটকার ৫৫ টাকা, অটোটেম্পু, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, অটোভ্যান ও ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান ২৫ টাকা, মোটরসাইকেল ১০ টাকা এবং রিকশা, ভ্যান ও বাইসাইকেল পাঁচ টাকা করে টোল নির্ধারত করা হয়েছে।
কাশিয়ানী শংকরপাশা গ্রামের গৃহবধু সুলতানা বেগম (৪৫) বলেন, আমার বাবার বাড়ি নড়াইলের লোহাগড়া। এই সেতুটি উদ্বোধনে আমি মহাখুশি। এখন মন চাইলেই বাবার বাড়ি চলে যেতে পারবো। আগের মতো বিড়ম্বণায় পড়তে হবে না। আর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমার অন্তরের অন্তস্থান থেকে দোয়া করবো।
কাশিয়ানী উপজেলার শংকরপাশা বাজারে কাঁচামাল ব্যবসা মো: সোহেল শেখ (৪২) বলেন, এই বাজারে তারা বাবা দীর্ঘ ২০ বছর ধরে কাঁচামালের ব্যবসা করেছে। এখন তিনি এই ব্যবসা করছেন। আগে ট্রাকে করে মালামাল আনতে নানাবিধ বিড়ম্বনার শিকার হতে হতো। সেতু চালু হওয়ার ফলে সহজে যশোর থেকে কাঁচামাল নিয়ে আসতে পারবেন। এতে সময় ও অর্থ দুটাই বাঁচবে। ব্যবসা ভাল হবে।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি চৌধুরী এমদাদুল হক বলেন, আমরা আগে চিন্তাও করিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেটি চিন্তা করেছেন। এ সেতুর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে উঠবে।
জেলা প্রশাসক শাহিদা সুলতানা বলেন, মধুমতি সেতু উদ্বোধনের ফলে গোপালগঞ্জে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। এতে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। যশোর অঞ্চলসহ গোপালগঞ্জের যোগাযোগসহ অর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটবে বলে মনে করেন, জেলা প্রশাসক।