মোঃ সোহাগ হাওলাদার, বরগুনাঃ
ফণি’ আম্পান’,ইয়াস’-এর পর এবার ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’ বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসছে। আন্দামান সাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় সৃষ্ট নিম্নচাপটি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়। থাইল্যান্ডের দেওয়া এই নামের অর্থ হলো ‘পাতা’।
ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’ এর প্রভাবে রবিবার (২৩ অক্টোবর) মধ্যরাত থেকে উপকূলীয় জেলা বরগুনায় অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছে। এদিকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার কে (৬)নম্বর এবং মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে (৭) নম্বর দূরবর্তী হুঁশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। ধারনা করা হচ্ছে ২০০৭ সালের ১৫ই নভেম্বর গভীর রাতে আঘাত-হানা ‘সিডর’ এর-পর ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’ মধ্যদিয়ে আবারো সেই ভয়াবহ চিত্র দেখতে যাচ্ছে দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষ।
উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে তাদেরকে গভীর সাগরে বিচরণ না করতে নিষেধ করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
বরগুনা জেলা সদরের ব্যবসায়ীরা জানান, ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’ এর প্রভাবে বাজারে মানুষজনের চলাচল নেই বললেই চলে। যার ফলে আমাদের বিক্রি তুলনামূলক অনেক কম। এজন্য অনেক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে ব্যবসায়ীদের।
জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান জানান, ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’ আঘাতের কথা মাথায় রেখে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বরগুনা জেলা প্রশাসন। ‘সিত্রাং’ মোকাবেলায় বরগুনায় ৬৪২টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে মানুষের পাশাপাশি গবাদি পশু ও রাখা যাবে। আশ্রয় কেন্দ্র গুলোতে বিশুদ্ধ পানি, শুকনা খাবার ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে নির্দেশনা দিয়েছে বরগুনা জেলা প্রশাসন। এছাড়াও নগদ ৫ লাখ ৭০হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, কোস্টগার্ড, সিপিপি, রেডক্রিসেন্ট, সহ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ফেসবুকে জানানো হয়: পূর্ব-মধ্যবঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন পশ্চিম-মধ্যবঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থানরত ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’ উত্তর উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগর এবং উত্তর বঙ্গোপসাগর এলাকায় (অক্ষাংশ: ১৭.৮° উত্তর, দ্রাঘিমাংশ: ৮৮.৮° পূর্ব) অবস্থান করছে। এটি আজ সকাল ০৬ টায় (২৪ অক্টোবর, ২০২২) চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৫৯০ কি.মি. দক্ষিণপশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৫৩৫ কি.মি. দক্ষিণপশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৫২৫ কি.মি. দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিমে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৪৯৫ কি.মি. দক্ষিণ দক্ষিণপশ্চিমে অবস্থান করছিল। এটি আরো ঘণীভূত ও উত্তর-উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে আগামীকাল ভোররাত সকাল নাগাদ খেপুপাড়ার নিকট দিয়ে বরিশাল-চট্টগ্রাম উপকূল অতিক্রম করতে পারে।
ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৫৪ কি.মি. এর মধ্যে বাতাসের একটানা সর্ব্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২ কি.মি., যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ৮৮ কি.মি. পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের নিকটবর্তী এলাকায় সাগর বিক্ষুব্ধ রয়েছে।
মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরসমূহকে ০৪ (চার) নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারী সংকেত নামিয়ে তার পরিবর্তে ০৭ (সাত) নম্বর বিপদ সংকেত (পুনঃ) ০৭ (সাত) নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ ০৭ (সাত) নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে।
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরসমূহকে ০৪ (চার) নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারী সংকেত নামিয়ে তার পরিবর্তে ০৬(ছয়) নম্বর বিপদ সংকেত (পুনঃ) ০৬ (ছয়) নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ ০৬ (ছয়) নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে।
সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার নদীবন্দরসমূহকে ০৩ (তিন) নম্বর নৌ-বিপদ সংকেত (পুনঃ) ০৩ (তিন) নম্বর নৌ-বিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড়টির অগ্রবর্তী অংশের প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ৫০-৬০ কি.মি. বেগে দমকা/ঝড়ো বাতাস বয়ে যেতে পারে, সেইসাথে ভারি (৪৪-৮৮ মি.মি.) থেকে অতিভারি (২ ৮৯ মি.মি.) বর্ষণ হতে পারে।
ঘূর্ণিঝড়টির অগ্রবর্তী অংশ, অমাবশ্যা তিথি ও বায়ুচাপ পার্থক্যের আধিক্যের প্রভাবে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহের নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ০৫-০৮ ফুট অধিক উচ্চতার বায়ুতাড়িত জলোচ্ছাসে প্লাবিত হতে পারে।
এছাড়াও উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত সকল মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে অতিসত্বর নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।