স্টাফ রিপোর্টার, গোপালগঞ্জ : গোপালগঞ্জে স্কুল ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনা পর আতংকে পুরুষশূণ্য হয়ে পড়েছে সদর উপজেলার খালিয়া ও ছোটফা গ্রাম। আবারো হামলা ও মামলার ভয়ে পুরুষ সদস্যরা বাড়ী ছাড়া হলেও শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে অবস্থান করছেন মহিলার। তারা আবারো হামলা ও ভাংচুরের আশংকায় নিরপত্তহীহতায় ভূগছে। তবে নিরাপত্তা দিতে কাজ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ প্রশাসন। এদিকে, এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে রাখতে নির্বাচন স্থাগিত করেছে জাতীয় শিক্ষা বোর্ড।
বুধবার (০২ অক্টোবর) সরেজমিনে গিয়ে জানাগেছে, খালিয়া ও ছোটফা গ্রামের বসতবাড়ী ও দোকানঘরগুলো বিধ্বস্ত। ঘরে চাল, টিনের বেড়া, আসবাবপত্রসক কিছুই তছনছ। যে ঘরে থাকতো কোলাহল সে ঘরগুলো এখন যেন নিস্তব্ধ। ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল সদর উপজেলার জালালাবাদ ইউনিয়নের খালিয়া ইউনাইটেড একাডেমি উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন। এ নির্বাচনের ভোট চাওয়া নিয়ে গত রোববার (৩০ অক্টোবর) সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান হেমায়েত উদ্দিন হিমু ও বর্তমান চেয়ারম্যান এফ এম মারুফ রেজার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটলে আহত হয় ২০জন।
পরে এর জের ধরে খালিয়া ও ছোটফা গ্রামে চলে তান্ডব। বাড়ী-ঘর ও দোকানে হামলায় চালিয়ে ভাংচুর করা হয়। লটুপাট করা মালামাল, নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ও গবাদিপশু। খুলে নিয়ে যাওয়া হয় নলকূপও। সেসব আসবাব পত্র নিতে পারেনি তা কুপিয়ে করা হয় তছনছ। যার ফলে অনেক বাড়ীতে জ্বলছে না চুলার আগুন। প্রতিবেশি বা আত্মীয় স্বজনের বাড়ী থেকে খাবার এতে চলছে ক্ষুধা নিবরনের কাজ। সহায়-সম্বল হারিয়ে আবারো হামলা আতংকে বৃদ্ধ ও শিশুদের নিয়ে দিন কাটছে নারীদের।
এদিকে হামলা ও মামলা আতংকে পুরুষ শূণ্য হয়ে পড়েছে গ্রাম দু’টি। মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তানদের ছেড়ে বাড়ী থেকে পালিয়ে অবস্থান করছেন বিভিন্ন স্থানে। তাদের উপর আবারো হামলা হতে পারে এ আতংকে আসতে পারছেন না নিজ বাড়ীতে। কোন পুরুষ না থাকায় বিপাকে পড়েছেন নারীরা। ভয় আর ভীতির মধ্যে থেকে তার কাটছে শিশু ও নারীদের। এ ঘটনার তিন দিন পার হলেও কোন মামলা দায়ের হয়নি। ফলে সুষ্ঠু বিচার না পাওয়ার আশংকায় রয়েছেন ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলো।
এদিকে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে রাখতে খালিয়া ইউনাইটেড একাডেমি উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন স্থাগিত করেছে জাতীয় শিক্ষা বোর্ড। বুধবার এক চিঠির মাধ্যমে নির্বাচনের উপর স্থাগিতাদেশ দেয়া।
ছোটফা গ্রামের ৮০ বছরের বৃদ্ধ হাসিয়া বেগম বলেন, “সংঘর্ষের জের ধরে আমার বাড়ীতে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করা হয়েছে। মালপত্র ভেঙ্গে তছনছ করা হয়েছে। জীবন বাঁচাতে আমা ছেলে নদী ঝাঁপিয়ে ওপার চলে যায়। আজ তিন দিন হলো আমার ছেলে ভয়ে বাড়ীতে আসতে না পারায় মুখ দেখতে পারিনি। আমি আমার ছেলের নিরাপত্তা চাই।”
একই গ্রামের টপি বেগম বলেন, “আমার ওই দিন বাড়ীর বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাত করে কয়েক’শ লোকজন আমাদের বাড়ীতে এসে হামলা চালায়। আমার গলায় দা ধরে ঘরের চাবি দিয়ে দরজা খুলে লুটপাট চালায়। পরে চলে যাবার সময় ঘর কুপিয়ে তছনছ করে।”
একই এলাকার হাসনা বেগম বলেন, “ঘরে বসে আমার মেয়ের জন্য খাবার তৈরী করতে ছিলাম। এসময় দরজা ভেঙ্গে লোকজন ঘরে প্রবেশ করে। পরে ঘরের আসবাবপত্র ভাংচুর করে নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কারসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করে চলে যায়। ঘটনা পর পুরুষরা বাড়ী ছেড়ে চলে যাওয়ায় আমরা আতংকের মধ্যে রয়েছি। আমরা কিভাবে নিরাপত্তার মধ্যে থাকবো ভেবে পাচ্ছি না।”
ক্ষতিগ্রস্থ লাকী বেগম বলেন, “আমার বাড়ীতে কোন পুরুষ সদস্য নেই। হঠাত করেই লোকজন বাড়ীতে ঢুকলে বাচ্চাদের নিয়ে ভয়তে ঘরে অবস্থান করি। পরে ঘরে ঢুকে সব কিছু কুপিয়ে কুপিয়ে ভেঙ্গে ফলে। নগদ টাকা, সোনা যে যা পেয়েছে নিয়ে চলে যায়।”
রিংকি ইসলাম বলেন, “বাচ্চাদের নিয়ে আমরা আতংকের মধ্যে দিন-রাত পার করছি। বাড়ীতে হামলা করায় আমার বাচ্চা প্রচন্ড ভয় পেয়েছে। কাজের কারনে আমাদের বাড়ীতে কোন পুরুষ থাকে না, শুধু মহিলারই থাকি। এভাবে আমরা মহিলারা কি ভাবে থাকবো আমরা নিরাপত্তা চাই।”
খালেদা বেগম বলেন, “আমার স্বামী অসুস্থ আর ছেলেরা বাইরে থাকে। আমার বাসায় লোকজন আসলে আমি তাদের পা ধরে বলি আমার বাসয় কেউ থাকে না তোমরা কেউ ঢুকো না। কিন্তু আমার কথা না শুনে আমার বাড়ী ভাংচুর করে।”
গোপালগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো: মোহাইমিনুল ইসলাম বলেন, “এ এলাকায় দুটি পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে রাখতে এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করেছি। এছাড়া অনান্যা আইনশৃংখলা রক্ষা কারী বাহিনী নিয়োজিত রয়েছে। এ ঘটনায় এখন পযর্ন্ত কোন মামলা দায়ের না হলেও নিরাপত্তাসহ পরিস্থিত দ্রুত স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: মোহসীন উদ্দিন বলেন, “এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে খালিয়া ইউনাইটেড একাডেমি উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন স্থাগিত করা হয়েছে। জাতীয় শিক্ষা বোর্ড এ স্থাগিতাদের আদেশ দেয়। এ চিঠি জেলা ও ঋপজেলা প্রশাসন এবং স্কুলে পৌঁছে দেয়া হয়েছে।” #