• ২৬শে জুন, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ , ১২ই আষাঢ়, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দেওয়া হয়না পুষ্টিকর খাবার,শিক্ষক না এলে ক্লাস নাস্তা দুটোই বন্ধ।

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত আগস্ট ২০, ২০২৩, ১২:৪৬ অপরাহ্ণ
দেওয়া হয়না পুষ্টিকর খাবার,শিক্ষক না এলে ক্লাস নাস্তা দুটোই বন্ধ।

আসাদুল ইসলাম, গাইবান্ধা

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে কিশোর কিশোরী ক্লাবে নিয়মিত ক্লাস না হ‌ওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নজরদারিতে না থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

গত কয়েক দিন ঘুরে দেখা যায়,নিয়মিত হয় না ক্লাস।কোথাও কোথাও নিয়মিত ক্লাস হলেও নেই নির্ধারিত সংখ্যক শিক্ষার্থী।যে কয়জন আছেন তাঁদের আবার নেই পোশাক। না আছে ডায়েরি ও আইডি কার্ডসহ শিক্ষা উপকরণগুলো। প্রক্সি শিক্ষক দিয়ে ক্লাস চলছে কোথাও কোথাও। তবলা নেই কোনো ক্লাবে। আবার কোথাও কোথাও নষ্ট হয়ে পরে আছে হারমনিয়াম আর তবলা। পুষ্টিকর খাদ্য দেয়া হচ্ছে না শিক্ষার্থীদের। শিক্ষক না এলে ক্লাস নাস্তা দুটোই বন্ধ থাকে।

উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের জামাল হাট সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থাপিত ক্লাবে গিয়ে দেখা গেছে শ্রেণী কক্ষ খোলা। নেই কোনো শিক্ষার্থী। টেবিলের উপরে পরে আছে রুমের তালা আর বেত। অপেক্ষার পর ৫ টা ১০ মিনিটের দিকে ফোন দেই প্রধান শিক্ষক মো. মাহাবুর রহমানকে। তিনি বাহিরে আছেন। কিশোর-কিশোরী ক্লাব সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তাঁর পরিষ্কার কোনো ধারণা নেই। সেক্ষেত্রে তাঁকে আগে খোঁজ নিতে হবে। ফোন কেটে দিয়ে পরে স্থানীয়দের সহায়তায় ক্লাবের ৩ জন শিক্ষার্থীকে ডেকে নেই স্কুলে। কথা হলে তারা বলেন, আজ এবং গতকাল স্যার আসেননি। আমরা কয়েকজন করে এসেছিলাম। স্যার না আসলে নাস্তা দেয়া হয় না বলেও জানান শিক্ষার্থীরা। এছাড়াও নানা অনিয়মের কথা উঠে আসে তাদের বক্তব্যে। যেন সবই অনিয়ম। আর এ চিত্র কেবলমাত্র এ ক্লাবেই নয়।

বেলকা ইউনিয়নের চৌমুহনী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থাপিত ক্লাবে গিয়ে সংগীত শিক্ষক বিপ্লবী সরকারের দেখা মিললেও নানা অনিয়মের কথা উঠে আসে শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে। হারমনিয়াম ও তবলা নষ্ট। রুমের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেয়ায় প্রচন্ড গরমে হাসফাঁস করেছেন ১৬ শিক্ষার্থী। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ওয়াশরুম। নেই শিক্ষার্থীদের পোশাক, আইডি কার্ড ও ডায়েরিসহ প্রয়োজনীয় শিক্ষা সামগ্রী। আবৃত্তির শিক্ষক না থাকায় জেন্ডার প্রমোটর দিয়ে চলে আবৃত্তি ক্লাস। ৩০ টাকা মূল্যের পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহের কথা থাকলে সেখানে দেয়া হয়েছে ২০ টাকা মূল্যের কেক ও বিস্কুট। এর আগের শনিবার ক্লাস হয়নি বলেও জানান শিক্ষার্থীরা।

দহবন্দ ইউনিয়নের হুড়াভায়া খা এ মান্নান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থাপিত ক্লাবে গিয়ে দেখা গেছে ১৩ শিক্ষার্থী ক্লাসে। আবৃত্তির শিক্ষক না থাকায় ক্লাস নিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার জেন্ডার প্রমোটর খোকন কুমার সরকার।
পরে রামজীবন ইউনিয়নের বাজারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থাপিত ক্লাবে গিয়ে দেখা যায় ৩/৪ জন শিক্ষার্থীকে কাছে নিয়ে আবৃত্তির পরিবর্তে গান শেখাচ্ছেন সংগীত শিক্ষক বাবু রাম মহন্ত। বাকী শিক্ষার্থীরা যে যার মতো করে বসে গল্প করছে। কেউবা আবার রুমের বাহিরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

কথা হয় সংশ্লিষ্ট এলাকার জেন্ডার প্রমোটার ফিরোজা আক্তারের সাথে,তিনি বলেন, এখানকার আবৃত্তি শিক্ষক না থাকায় গত জানুয়ারি থেকে আমি ক্লাস নিচ্ছি। দেরি আসার কারণ জানতে চাইলে বলেন, রামজীবন, ধোপাডাঙ্গা ও তারাপুর ইউনিয়নসহ পৌরসভা দেখতে হয় আমাকে। সে কারণে টাইমিং এ সমস্যা হয়।

ক্লাসে অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে
জামাল হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থাপিত ক্লাবের সংগীত শিক্ষক রীনা রহমান বলেন, ‘হামদ নাত প্রতিযোগিতায় থানা ফাস্ট হয়েছিলো আমার মেয়ে। আজকে জেলায় অনুষ্ঠান। সেখানে তাঁকে নিয়ে এসেসি। সে কারণে ক্লাসে যেতে পারিনি। তবে বিষয়টি জানাতে জেন্ডার প্রমোটরকে একাধিক বার ফোন দিয়েছি। তিনি ফোন ধরেননি।’
অনুপস্থিত থাকার কারণ জানতে চাইলে আবৃত্তি শিক্ষক আরমান বলেন, ‘আমি জেন্ডার প্রমোটরকে বিষয়টি জানিয়েছি।’জেন্ডার প্রমোটর খোকন কুমার সরকার ফোন দেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ‘ঢাকায় ছিলাম সে কারণে আসতে পারিনি।’

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মো. আবুল ফাত্তাহ বলেন, ‘কেক ও বিস্কুট পুষ্টিকর খাদ্য নয়। সেক্ষেত্রে অবশ্যই ডিম, দুধ ও ফল থাকতে হবে।’

তদারকির দায়িত্বে থাকা উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকতা সুমী কায়সার আবৃত্তির শিক্ষক সংকট আছে ও তবলচি নিয়োগ দেয়া হয়নি বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, আমি ছুটিতে আছি,ছুটি শেষে দেখা করেন বক্তব্য দেবো।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ নূর-এ- আলম বলেন, ‘শিক্ষক সংকট আছে। এটি সমাধান হলেই শিক্ষার্থী বাড়বে আশা করছি। কেনো তাঁদের পুষ্টিকর খাদ্য দেয়া হচ্ছে সে বিষয়ে খোঁজ নিয়ে ব্যাবস্থা নেয়ার কথাও জানান ইউএনও।’

তথ্যে জানা যায়, মহিলা ও শিশুবিষয়ক অধিদপ্তর পরিচালিত ‘কিশোর-কিশোরী ক্লাব স্থাপন’ প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুসারে, সপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার বিকেল ৩ টা থেকে ৫ টা পর্যন্ত ক্লাবগুলোতে ক্লাস নেয়ার নিয়ম। ক্লাব প্রতি ৩০ জন করে সদস্য বা শিক্ষার্থী থাকবে। এরমধ্যে ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী ২০ কিশোরী ও ১০ কিশোর। সংগীত, আবৃত্তি, কারাতের মতো সৃজনশীল ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরের কিশোর-কিশোরীদের সম্পৃক্ত করার মধ্য দিয়ে জেন্ডারভিত্তিক নির্যাতন, বাল্যবিবাহ ও মাদক প্রতিরোধ এবং প্রজনন স্বাস্থ্য ইত্যাদি বিষয়ে সচেতনতা করাই এ প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য।

এ উপজেলার ১৬ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ ক্লাব স্থাপন করা হয়েছে। নিয়মে বলা আছে শুক্রবার সংগীত ও শনিবার আবৃত্তি শেখানো হবে। সংগীত ও আবৃত্তির ২ জন শিক্ষকও আছে। ৩০ টাকা মূল্যে ৩০ জন শিক্ষার্থীর জন্য ৩০ প্যাকেট পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহের নিয়মও আছে। থাকতে হবে হারমনিয়াম, তবলা, লুডু, দাবা ও ক্যারাম। এছাড়াও শিক্ষার্থীদের পোষাক, আইডি কার্ড ও ডায়েরিসহ বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ থাকার কথা ছিলো।