মো: ইমন হোসেন, ঢাবি প্রতিনিধি:
বর্তমান সময়ের অন্যতম আলোচনার ইস্যু ট্রান্সজেন্ডার নিয়ে। ঢাবি ভর্তি পরীক্ষায় ট্রান্সজেন্ডারদের জন্য কোটা চালু করা হয়। বিষয়টি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্ররা প্রথমে মানববন্ধন,পরবর্তীতে সংবাদ সম্মেলন এবং আজ ৩ জানুয়ারি ২০২৪ দুপুর ২টা থেকে অবস্থান কর্মসূচিতে বসেছেন ।
তাদের দাবি ট্রান্সজেন্ডার শব্দটি যতদিন বাদ না দেওয়া হচ্ছে ততদিন তাদের এ সংগ্রাম চলতে থাকবে। অবস্থান কর্মসূচিতে তারা নিম্নোক্ত লিখিত বক্তব্যটি পেশ করেছেন :
“আপনারা সকলেই অবগত রয়েছেন যে গত ১৭ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় রেজিস্টার প্রবীর কুমার সরকার স্বাক্ষরকৃত ২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। উক্ত বিজ্ঞপ্তিতে কোটার অংশে হিজড়া বোঝাতে বিকল্প চিহ্ন দিয়ে উল্লেখিত ‘ট্রান্সজেন্ডার’ শব্দটি শিক্ষার্থীদের প্রবলভাবে আহত করে। পরবর্তীতে সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত সময়ের মধ্যে এই বিজ্ঞপ্তি ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি দেশের সর্বস্তরের জনসাধারণ মারাত্মকভাবে ব্যাথিত হন। দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সামালোচনার জন্ম
নেয় ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাই ভর্তি বিজ্ঞপ্তি থেকে ‘ট্রান্সজেন্ডার’ শব্দের প্রত্যাহারের দাবী তুলে। যে দাবী জনদাবীতে পরিণত হলে গত ২১ ডিসেম্বর’২৩ বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বস্তরের শিক্ষার্থীরা সন্ত্রাস বিরোধী রাজু ভাস্কর্যের সামনে মানববন্ধনের আয়োজন করে। মানববন্ধন শেষে ভর্তি বিজ্ঞপ্তি থেকে ‘ট্রান্সজেন্ডার’ শব্দটির প্রত্যাহার জানিয়ে শিক্ষার্থীরা মাননীয় উপাচার্য বরাবর একটি স্মারকলিপি প্রদান করে ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা আশা করেছিল এক সপ্তাহের মধ্যে শিক্ষার্থীদের দাবী মেনে নেওয়া হবে এবং ভর্তি বিজ্ঞপ্তি থেকে ‘ট্রান্সজেন্ডার’ শব্দটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে।
কিন্তু এক সপ্তাহ অতিক্রম হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও আমাদের দাবী মেনে নেওয়া হয় নি। ফলশ্রুতিতে সর্বস্তরের শিক্ষার্থীরা মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছে।
পরবর্তীতে আমরা গত ৩০ ডিসেম্বর’২৩ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতির মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলন করে শিক্ষার্থীদের দাবী আমরা পুনরায় ব্যক্ত করি। আমরা আশা করেছিলাম মাননীয় উপাচার্য ১লা জানুয়ারী ২৪ তারিখের মধ্যে আমাদের দাবী মেনে নিবেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও এটা সত্য যে আমাদের দাবী মেনে নেওয়া হয়নি। তাই আমরা বাধ্য হয়ে রাজপথে নেমে আসতে বাধয় হয়েছি।
মাননীয় উপাচার্য মহোদয় গত ২১ ডিসেম্বর ২৩ আমাদেরকে জানিয়েছিলেন যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ট্রান্সজেন্ডার শব্দ দ্বারা হিজড়াদেরকেই সম্বোধন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সমকামী তথা রূপান্তরকামীদেরকে বিকৃত মানসিকতার মনে করে। এবং তারা চান না যে এই কোটার মাধ্যমে এই ধরণের বিকৃত মানসিকতার কেউ সুযোগ পাক। তিনি জানান যে তাদের মেডিকেল টিম রয়েছে যারা ভালো করে যাচাই বাচাই করার মাধ্যমেই কোটায় অন্তর্ভুক্ত করবেন। তারা চান পিছিয়ে পড়া হিজড়া জনগোষ্ঠীর অধিকারকে নিশ্চিত করতে। তাদেরকে সমাজে অগ্রসর করতে। তিনি আরও বলেন যে ট্রান্সজেন্ডার মানে রূপান্তরকামী তথা নারী থেকে পুরুষ, পুরুষ থেকে নারীতে রূপান্তরিত হওয়া নয় । ট্রান্সজেন্ডার বলতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হিজড়াদেরকেই বুঝিয়েছে।
আমরা প্রথমেই এটা পরিষ্কার করে বলতে চাই, হিজড়া ও ট্রান্সজেন্ডার এক নয়। ট্রান্সজেন্ডার শব্দ দ্বারা শুধু হিজড়াদেরকেই বোঝানো হয় না। বরং যারা নিজের খেয়াল খুশিমত নিজেকে ছেলে/মেয়ে দাবি করবে তাদেরকেও অন্তর্ভুক্ত করে। আমরা হিজড়া জনগোষ্ঠীর কোটার অধিকারের পক্ষে। আমাদের তিন দফা দাবীর অন্যতম একটি হলো, হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বিঘ্নে পড়াশোনার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রতি ৫০০০ জনে সর্বোচ্চ একজন হিজড়া হিসেবে জন্ম নিতে পারে। সেই হিসেবে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ৩০-৩৫ হাজার হিজড়া থাকতে পারে। মানবিক দিক বিবেচনায় হিজড়াদের পাশে দাঁড়ানো গুরুত্বপুর্ণ সামাজিক দায়িত্ব। ডায়াগনোস্টিক পরীক্ষার (জেনেটিক এবং বায়োকেমিকেল) মাধ্যমে লিঙ্গ পরিচয় শনাক্ত করে হিজড়াদের পড়ালেখা, আবাস ও কর্মসংস্থান তৈরিতে পদক্ষেপ গ্রহণ হবে যাতে তারা দেশের দক্ষ জনবল হয়ে গড়ে ওঠে। এজন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা হিজড়াদের অধিকার রক্ষার স্বার্থেই এই আন্দোলন করে যাচ্ছি।
ভিসি স্যার ট্রান্সজেন্ডার ইস্যুতে নীতি নির্ধারনের জন্য যাদের উপর নির্ভর করেছেন, আমরা তাদের উপর আস্থা রাখতে পারছি না। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে হিজড়াদের সাথে ট্রান্সজেন্ডার শব্দটিকে অন্তর্ভুক্ত করে ট্রান্স কালচারের মতো সমাজ ও সংস্কৃতি পরিপন্থি একটি বিকৃত সংস্কৃতিকে পৃষ্ঠপোষকতা করার চেষ্টা করছেন। তারা জেনে বুঝেই ট্রান্সজেন্ডার এবং হিজড়া শব্দকে এক করে ফেলার চেষ্টা করছেন। যেহেতু মাননীয় উপাচার্য বলেছেন যে ‘ট্রান্সজেন্ডার’ শব্দ দ্বারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সুবিধাবঞ্চিত হিজড়া জনগোষ্ঠীকে বুঝিয়েছে। কিন্তু Oxford University Press থেকে প্রকাশিত A Dictionary of Gender Studies Transgender ce Transgender Refers to gender identity and includes people who identify as female or male but were born or assigned the other sex at birth. Merriam-Webster America’s Most Trusted Dictionary তে Transgender বলতে বুঝিয়েছে of, relating to, or being a person whose gender identity is opposite the sex the person was identified as having at birth. বিবিসি গত ১৯ ডিসেম্বর ২০23 What is trans and what is the transgender guidance for schools? শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে- যে নিবন্ধে বিস্তারিতভাবে বুঝানো হয়েছে যে ট্রান্সজেন্ডার মানে রূপান্তরকামী। যেখানে একজন পুরুষ শুধু মনের পার্থক্যের কারণে নিজেকে নারী হিসেবে পরিচয় দিতে পারবেন। যার জন্য তাকে অন্য কোনো শারীরিক পরিবর্তন আনতে হবে না। নিবন্ধে বলা হয়েছে, A transgender person’s gender identity is not the same as the sex recorded on their original birth certificate. উল্লেখিত তথ্যপ্রমাণ সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে।বিশ্বব্যাপী একাডেমিক সংজ্ঞায়নে ‘ট্রান্সজেন্ডার’ শব্দটি এভাবেই প্রচলিত এবং পৃথিবীব্যাপী এভাবেই ব্যবহৃত হয়। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে পৃথিবীব্যাপী প্রচলিত সংজ্ঞায়নের বিপরীতে নতুন সংজ্ঞায়ন দাড় করালে তা স্থায়ী হবে না। বরঞ্চ ‘ট্রান্সজেন্ডার’ শব্দটি ভুলভাবে ব্যবহৃত হওয়ার মাধ্যমে একটি ভিন্ন গোষ্ঠীর জন্য সুযোগ তৈরী করবে।ফলশ্রুতিতে সুবিধাবঞ্চিত হিজড়া জনগোষ্ঠীর নিজেদের প্রাপ্য অধিকার থেকেও বঞ্চিত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে । তাই সুবিধাবঞ্চিত হিজড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার স্বার্থে আমরা ভর্তি বিজ্ঞপ্তি থেকে ‘ট্রান্সজেন্ডার’ শব্দটি বাতিলের জোর দাবী জানাচ্ছি।আপনারা নিশ্চয়ই জানেন যে ‘ট্রান্সজেন্ডার’ শব্দটি আমাদের দেশীয় শব্দ নয়। এমনকি বাংলা একাডেমির অভিধান, বিশেষ করে Bangla Academy Bengali – English Dictionary (32nd Reprint: Paush 1422 / December 2015, Edited by: Mohammad Ali), Bangla Academy English – Bangla Dictionary (Revised & Enlarged 2nd Edition, Seventh Reprint: Magh 1421 / January 2015, Edited by: Zillur Rahman Siddiqui) ও বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান (পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত সংস্করণের দ্বিতীয় পুনর্মুদ্রণ আশ্বিন ১৪২৪/ সেপ্টেম্বর ২০১৭, সম্পাদক- জামিল চৌধুরী) এই তিনটি অভিধানের কোথাও ‘ট্রান্সজেন্ডার’ শব্দটির কোনো উল্লেখ নেই। তবে হিজড়া শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে hermaphrodite ও eunuch এর উল্লেখ থাকলেও এগুলো ব্যতিত অন্যকোনো শব্দের উল্লেখ নেই ।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ভাইরোলজি বিভাগ ২০২১ সালে একটি জরিপ প্রকাশ করে । যাতে দেখা যায় দেশে পুরুষ সমকামী ও ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেড়েছে এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্তের হার। এছাড়া দেশে সিফিলিসের প্রাদুর্ভাবও বেড়েছে। ২০১৭ সালে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ থাকলেও এ বছরের গবেষণায় সিফিলিসের প্রাদুর্ভাব ১১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জরিপে দেখা গেছে যে ট্রান্সজেন্ডার ১ হাজার ৭২ জন এই মরণব্যাধী এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত। আপনারা জানেন যে এইচআইভি একটি সংক্রমক রোগ যার কোনো চিকিৎসা নেই ।ট্রান্সজেন্ডারকে প্রোমোট করার ফল ভয়াবহ ।
পশ্চিমা দেশগুলোতে এই মতাদর্শ পলিসি বাস্তবায়নের ফলে বিভিন্ন সামাজিক, স্বাস্থ্য এবং আইনগত সমস্যা গত কয়েক বছরে অনুধাবন করা যাচ্ছে। এটি হাজার হাজার বছরের প্রতিষ্ঠিত লিঙ্গভিত্তিক সিস্টেমকে ওলোট-পালট করে দিচ্ছে, তৈরি হচ্ছে নানা বিতর্ক । এক যুগ কম সময়ের মধ্যেই শিশু-কিশোরদের মাঝে ট্রান্সজেন্ডার আইডেন্টিটি নেওয়ার হার ব্যাপকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। আমেরিকায় ২০১০ তুলনায় জেন্ডার ডিস্ফোরিয়া (যারা নিজেদের ভুল দেহে আটকা পড়েছে বলে মনে করে) ইস্যুতে (এটা মানসিক সমস্যা মনে করা হয় না) ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে আসা শিশু-কিশোরদের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৫০০০%, ইংল্যান্ডের ছেলেদের মধ্যে বেড়েছে ১৪৬০%, আর মেয়েদের ক্ষেত্রে তা হয়েছে ৫৩৩৭%। সুইডেনে বেড়েছে ১৪০০% এবং ডেনমার্কে বেড়েছে ৬৭,০০০% । ২০২২ সালের সমীক্ষা অনুসারে আমেরিকার তরুণ প্রজন্মের (যাদের জন্ম ১৯৯৭-২০০২ সালে, এদের Z Gener at i on বলা হয়) প্রায় ২১% এলজিবিটি আইডেন্টিটি গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে যাদের জন্ম ১৯৬৫ সালের আগের হয়েছিল তাদের মধ্যে এটা ছিল মাত্র ২% । আমেরিকার এবং ব্রিটেনের তরুণ প্রজন্মের প্রায় ৪০% নিজেদের জন্মগত লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে সন্দিহান বা বিশ্বাসী নন, অর্থাৎ নন- বাইনারি (এখনো জেন্ডার পরিচয়ে ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে)। অন্যভাবে বলা যায় তারা এলজিবিটি এই মতাদর্শে বিশ্বাসী ।
ট্রান্সজেন্ডারদের চিকিৎসা না করে তাদের প্রোমোট করা হলে আমাদের ঘনবসতিপূর্ণ দেশে দ্রুত সময়ের মধ্যে এই মরণব্যাধী ছড়িয়ে পড়ে দেশে করোনার চেয়ে ভয়াবহ আরেক মহামারী নিয়ে আসতে পারে। বাংলাদেশের অস্তিত্বের বিরোধী একটী পশ্চিমা গোষ্ঠী ও তাদের দোসররা পরিকল্পিতভাবে এই দেশে মহামারী ছড়িয়ে নিজেদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার পায়তারা করছে।আপনারা জানেন যে ২০২৩ সালের শুরুতে জেলখানায় এক ট্রান্সজেন্ডার নারী (জন্মগত পুরুষ) প্রকৃত নারীকে (রুমমেট) ধর্ষণের ইস্যুতে স্কটল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগে (১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩) বাধ্য হোন। স্কুলের পাঠ্যক্রমে ট্রান্সজেন্ডার বা এলজিবিটি মতাদর্শ অন্তর্ভুক্তির প্রতিবাদে গত ২০ সেপ্টেম্বর কানাডার লক্ষ লক্ষ (মিলিয়ন মার্চ) পিতামাতা রাস্তায় নেমে আসেন। হিজড়া এবং ট্রান্সজেন্ডার শব্দের মৌলিক পার্থক্য না বুঝার করার কারণে ২০১৮ সালে পাকিস্তানে ট্রান্সজেন্ডার বিল সংসদে পাস হয়। কিন্তু জন্মগত লিঙ্গ পরিচয়ের সাথে মনস্ত্বাত্তিক জেন্ডার পরিচয় অন্তর্ভুক্তির কারণে সমাজে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে বিধায় কোর্ট ১৭ মে ২০২৩ আইনটি বাতিল ঘোষণা করে। হ্যাংগেরি-উগান্ডার মতো দেশগুলো ট্রান্সজেন্ডাদের লিগালাইজেশন বন্ধ ঘোষণা করেছে। বিশ্বের বিখ্যাত টেক বিলিনিয়ার ইলন মাস্ক ট্রান্সজেন্ডার মতাদর্শের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিয়েছেন। এই বিষয়ে তিনি মাঝে মাঝে সোস্যাল মিডিয়াতে পোস্ট দিয়ে পিতামাতাকে সচেতন রাখেন। এই বিষয়টির ভয়াবহতা অনুধাবন করাতে সম্প্রতি তিনি একটি ভিডিও ডকুমেন্টারি (what is a woman) শেয়ার করেন। এক সপ্তাহের মধ্যে বিশ্বের ১৭০ মিলিয়ন মানুষ ভিডিওটি দেখেছে ।
সেখানে আমাদের দেশে সপ্তম শ্রেণির পাঠ্য বইতে শরীফার গল্প এড করার মাধ্যমে সমকামীতাকে প্রোমোট করা হচ্ছে। আমার বিশ্ববিদ্যালয় যেটি দেশবাসীর নিকট আইকন তারা জ্ঞাত/অজ্ঞাতসরে ট্রান্সজেন্ডারকে শুধু গ্রহণই করছে না বরঞ্চ ট্রান্সজেন্ডারকে কোটায় অন্তর্ভুক্ত করে পৃষ্ঠপোষকতা করছে।
ট্রান্সজেন্ডার কে সমাজে প্রোমট করা হলে এর ফল আরও মারাত্মক ভয়াবহ হতে পারে সামজিক ক্ষেত্রে।
১. ট্রান্সজেন্ডার নিয়ে প্রস্তাবিত আইনে জন্মগত কোন মেয়ে নিজেকে ট্রান্সজেন্ডার পুরুষ (প্রকৃত মেয়ে) দাবি করে পুরুষের সমান সম্পত্তি পেতে আইনত বাধা নেই। আমাদের দেশের জন্য মতো অত্যন্ত দুর্বল সামাজিক এবং আইনিব্যবস্থায় এর সুদুরপ্রসারী প্রভাব কত ভয়ংকর হতে পারে তা অনুমেয় । জন্মগত লিঙ্গ পরিচয়কে উপেক্ষা করা হলে সামাজিক ভারসাম্য কার্যত ভেঙে পড়বে।
২. নারীরা বিভিন্ন কারণে সামাজিক বৈষ্যমের শিকার হয়। বৈষম্য নিরসণে নারীদের প্রমোট করতে জব সেক্টরে নির্দিষ্ট কোটা সিস্টেম রয়েছে। যেমন সরকারী প্রাইমারি শিক্ষা কার্যক্রমে শতকরা ৮০ শতাংশ নারীদের জন্য নির্ধারিত। ট্রান্সজেন্ডার নারীরা সেই পজিশনগুলোতে প্রতিযোগিতা করতে আইনি বাধা থাকার কথা নয় ।
৩. অলিম্পিকের পরিবর্তিত নিয়মে ট্রান্সজেন্ডারদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ২০২০ সালের টোকিও অলিম্পিকে ১৮২ জন ট্রান্সজেন্ডার অংশ নেয়, রিওডো জেনিরো অলিম্পিকে (২০১৬) ছিল ৫৬ এবং লন্ডন অলিম্পিকে (২০১২) অংশ নেয় ২৩ জন। নিউজিল্যান্ডের ট্রান্স মেয়ে Laurel Hubbar d ভারউত্তোলনে কলেজ পর্যায়ে পুরুষ হিসেবে রেকর্ড করেছিল স্থানীয় প্রতিযোগিতায় কিন্তু ২০১২-তে সে মেয়ে হিসেবে অলিম্পিকে অংশগ্রহন করে বিশ্ব রেকর্ড গড়ে কয়েকটি পদক জিতে নেয় মহিলা ইভেন্টে।
ক্রিকেটার ম্যাক্সিন ক্লিথিন কেন্ট কাউন্টির টিমে প্রথম ট্রান্স মহিলা হিসেবে অংশ নেয়া তার ব্যাটিং গড় ১২৪ রান। কিন্তু পুরুষ ক্রিকেটার হিসেবে ব্যাটিং গড় ছিল মাত্র ১৫ রান!
৪. বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ট্রান্সজেন্ডার নারী (অর্থাৎ জন্মগত পুরুষ) কোন হলে সিট পাবে? ক্যাডেট কলেজ এবং আর্মি ব্যারাকে কেউ ট্রান্সজেন্ডার ঘোষণা দিলে তার স্থান কোথায়ও হবে? তারা কোন কোন টয়লেট ব্যবহার? দিন দিন এই সমস্যাগুলো পশ্চিমা সমাজে প্রকট হয়ে উঠছে। ট্রান্সজেন্ডার হিসেবে মেয়েদের টয়লেট-লকার রুম ব্যবহার করার প্রাইভেসি নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোতে বিবৃত অবস্থায় পড়েছে প্রকৃত মেয়েরা। ব্রিটেনের মিনিস্ট্রি অব জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের তথ্য অনুযায়ী- জেলখানায় ১৭৬ জন ট্রান্সজেন্ডার নারীর (জন্মগত পুরুষ) ৭৬ জন যৌন নির্যাতনমূলক অপরাধে জড়িত হয়। এদের ৩৬ জন ধর্ষণ (rape is def i ned as penet r at i on with peni s) এবং ১০ জন ধর্ষণের প্রচেষ্টার জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়। এখানে যে বিষয়টা জানা গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে ৯৭% (ব্রিটেন এবং আমেরিকার ডাটা) এর বেশি ট্রান্সজেন্ডার নারীতে পুরুষাঙ্গ থাকে।
৫. European Journal of Endocrinol ogy নামক বিখ্যাত জার্নালে প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণার তথ্যানুসারে হরমোন চিকিৎসা নেওয়া ট্রান্সজেন্ডার নারীদের ৯৫% এর হৃদরোগের ঝুঁকি বেশি। ডায়াবেটিস, সিফিলিস, এইচআইভি এগুলোতো আছেই।মাংকিপক্স ভাইরাসে কাক্রান্ত ৯৫% এর বেশী এলজিবিটির অন্তর্ভুক্ত।আত্মহত্যার হার ও প্রচেষ্টা এদের মধ্যেই সব থেকে বেশী । ডিপ্রেশন মাদকাসক্ত ইত্যাদি সমস্যা তো আছেই ।
Old Testament (Chapter 20, verse 13 of Leviticus), Holy Bible (Romans 1:26-28) the Surah Al Araf (80-81), the Holy Quran সহ পৃথিবীর প্রায় সকল ধর্মগ্রন্থ ট্রান্সজেন্ডার তথা সমকামীতাকে নিষিদ্ধ ঘোষোণা করেছে। বাংলাদেশের সকল পর্যায়ের ধর্মপ্রাণ মানুষ এর বিরোধী। বাংলাদেশের দন্ডবিধি ৩৭৭ ধারা অনুসারে সমকামিতা তথা ট্রান্সজেন্ডারকে প্রকৃতি বিরুদ্ধ মনে করে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের শাস্তি প্রদান করা হয়। কেননা এটি আমাদের ধর্মীয় ও আইনের পরিপন্থী এবং পশ্চিমা সংস্কৃতির বিকৃত বহিঃপ্রকাশ মাত্ৰ ।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মার্চ ২০২৩-এ সিএনএন কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সামাজিক প্রেক্ষাপটে এলজিবিটি আইন্ডেন্টিটি স্বীকৃতি দেওয়ার বিপক্ষে বলে মন্তব্য করেন। ১৩ এপ্রিল ২০২২ সালে এই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এই বিষয়ে শক্তিশালী বিবৃতি দিয়েছেন । এলজিবিটি আমাদের ইসলাম ধর্মের পরিপন্থি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যুগান্তর পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন- এলজিবিটিদের (লেসবিয়ান, সমকামী, রূপান্তরকামী) জন্য বাংলাদেশে আইন নেই এবং বাংলাদেশ তাদের প্রয়োজন মেটাতে পারছে না- এমন কথাও বলা হয় । এ বিষয়ে শাহরিয়ার আলম বলেন, এটা আমাদের ইসলাম ধর্মের পরিপন্থি। পৃথিবীর এমন একটা মুসলিম দেশ দেখান যারা এলজিবিটিকে অনুমোদন দেয়। যত দেশ বা সংস্থা থেকে চাপ আসুক না কেন এলজিবিটি প্রশ্নে কোনো ছাড় দেবে না বাংলাদেশ। এটা বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে বিরোধিতা করা হবে, ধর্মের সঙ্গে বিরোধিতা করা হবে । এ থেকে
স্পষ্টত প্রতিয়মান হয়, ট্রান্সজেন্ডারিজম বাংলাদেশে ধর্মীয়ভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং আইনগতভাবে নিষিদ্ধ। জোর করে এই মতাদর্শ আইনগতভাবে চাপানো হলে দেশে ধর্মীয় উগ্রবাদ উসকে দেয়া হবে ।
এমতাবস্থায় কোন যুক্তিতে একটি বিতর্কিত শব্দকে কেনো ভর্তি বিজ্ঞপ্তিতে যুক্ত করা হলো তা- আমাদের বোধগম্য নয়। আমরা মনে করি ভর্তি বিজ্ঞপ্তিতে এই শব্দ সংযুক্তির মাধ্যমে দেশীয় কৃষ্টি ও সংস্কৃতির উপর আঘাত করা হয়েছে। আমাদের দেশজ সংস্কৃতি, জীবনের নিরাপত্তা রক্ষায় এই শব্দটি প্রত্যাহার করা অত্যন্ত জরুরী।
একজন পুরুষ যদি নিজেকে পুরুষ বলে পরিচয় দিতে পারে, একজন নারী যদি নিজেকে নারী বলে পরিচয় দিতে পারে তাহলে তাহলে একজন হিজড়া অবশ্যই নিজেকে হিজড়া বলেই পরিচয় দিবে। তাকে ভিন্ন কোনো পরিচয়ে পরিচিত করণ করা মানে হচ্ছে হিজড়া সম্প্রদায়কে খাটো করা- অধিকার ও সম্মানকে ক্ষুন্ন করা। এছাড়া একান্তই যদি তাকে ইংরেজিতে পরিচিত করতে হয় এজন্য্য আমাদের বাংলা একাডেমির অভিধান রয়েছে। সেখানে উল্লেখিত হিজড়া শব্দের প্রতিশব্দই ইংরেজি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। বিদেশ থেকে শব্দ আমদানী করা মানে আমাদের ভাষা রক্ষার আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছে তাদেরকে অপমানিত করার মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে অপমান করা। কেননা বাংলা ভাষা রক্ষার জন্যই ভাষা আন্দোলনের ফসল হিসেবে বাংলা একাডেমি গড়ে উঠেছিল। এছাড়া বাংলাদেশের দন্ডবিধি ৩৭৭ অনুযায়ী বাংলাদেশে ট্রান্সজেন্ডার তথা সমকামীতা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই ট্রান্সজেন্ডার শব্দটিকে অবশ্যই ভর্তি বিজ্ঞপ্তি থেকে প্রত্যাহার করতে হবে। এবং এ নিয়ে কোনো টালবাহানা বরদাশত করা হবে না ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সবসময়ই শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে। আমরা কখনোই আন্দোলনে নেমে আমাদের পঠন পাঠন ছেড়ে রাজপথে এসে আমাদের সময় নষ্ট করতে আগ্রহী নই। কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে দেশ-জাতি রক্ষায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান রক্ষায় আমরা রাজপথে নেমে আসতে বাধ্য হয়েছি। দাবী আদায় না হলে আমরা পড়ার টেবিলে ফিরে যাবো না। দাবী আদায়ের মাধ্যমেই আমরা আমাদের পড়ার টেবিলে ফিরে যাবো।”
উল্লেখ্য, আজ বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত এ অবস্থান কর্মসূচী চলমান থাকবে। এরপরও তাদের দাবি মেনে না নেওয়া হলে আগামীকাল সকাল থেকে অনশন কর্মসূচিতে বসবেন তারা।