স্টাফ রিপোর্টার, গোপালগঞ্জ : পৌষের শীতে মঞ্চের সমানে উৎসুক দর্শদের ভীড়। সেই মঞ্চে গভীর রাত পর্যন্ত দুই কবিয়ালের মধ্যে চলে বাক আর তর্ক-বিতর্কের যুদ্ধ। মন্ত্র-মুগ্ধের মত নির্ঘুম রাত কাটে দর্শকদের। যেন ভাবনা ছুয়ে গেছে আকাশের চাঁদকেও………..
কবি গানের এ দৃশ্য এখন শুধুই কাল্পনিক। সময়ের সাথে সাথে এ সকল দৃশ্যও যেন আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় মঞ্চে হ্যাচাক লাইটের আলো না থাকলে থাকে বৈদুতিক আলোর ঝলকানি। কিন্তু তারপরেও শিকড় সন্ধানী কিছু মানুষ এখনও এ কবি গানকে খুঁজে বেড়ায় মনের অজান্তে। হারিয়ে যাওয়া এ স্মৃতির দৃশ্যে কিছুটা সময়ের জন্য হলেও খুঁজে পান সেই আনন্দ।
এরকম কিছু মানুষের জন্য বারোয়ারী শীতলাপূজা, ত্রিনাথ ও কালী পূঁজা উপলক্ষে বুধবার (১০ জানুয়ারী) ও বৃহস্পতিবার (১১ জানুয়ারী) রাতে দুই দিনব্যাপী কবি গানের আয়োজন করে খাটরা সার্বজনীন কালীবাড়ী কমিটি।
মাঠের মাঝখানে বানানো মঞ্চে দুই কবিয়ালের বাক আর তর্ক-বিতর্কের যুদ্ধ। মুগ্ধ দর্শকদের নির্ঘুম রাত আর সেই সাথে ভাবনা। এ স্মৃতি এখন শুধুই কাল্পনিক। কালের বিবর্তনে এবং আধুনিকতার বেড়াজালে পড়ে এসব গানের শ্রোতা একদিকে যেমন কমে গেছে, তেমনি গায়কও কমে গেছে।
কবি গানের আসরে গুরুশিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ ও রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব পালায় উপমহাদেশের প্রখ্যাত কবিয়াল সঞ্জয় সরকার প্রশ্ন ছুড়ে দেন অপর কবিয়াল মনি শংকর সরকারের অপূর্ব সরকারের কাছে। পরে গানের তালে তালে তিনিও দিতে থাকেন প্রশ্নের পাল্টা উত্তর।
কবিয়ালদের যুক্তি-তর্কের মনোমুগ্ধ হয়ে ওঠে প্রাঙ্গণ। তাদের যুক্তিতর্ক ও গান শুনে মুগ্ধ হন হাজারো শ্রোতা। প্রখ্যাত দুই কবিয়ালের কবিগান শুনতে শুধু গোপালগঞ্জই নয় আশপাশের উপজেলা ও জেলা থেকে বিপুল সংখ্যক শ্রোতা উপস্থিত হন অসরে। এর মধ্যে তরুন প্রজন্মের যুবক-যুবতীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পরার মত। কবি গানের যে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা হয় তা তরুন সমাজকে সুপথে নিয়ে আসতে পারে। হারিয়ে যাওয়া এ কবি গান শুনতে পেরে খুশি দর্শকেরা।
এক সময়ে কবি বিজয় সরকারের গান মন্ত্র-মুগ্ধের মতো শুনতেন এ অঞ্চলের শ্রোতারা। এ এলাকার মানুষের বিনোদনের একটি বড় মাধ্যম ছিল কবি, জারি, সারি গান। তার মধ্যে কবি গান ছিল অন্যতম। কালের বিবর্তনে এবং আধুনিকতার বেড়াজালে পড়ে এসব গানের শ্রোতা একদিকে যেমন কমে গেছে, তেমনি গায়কও কমে গেছে।
কবিয়াল সঞ্জয় সরকার বলেন, কবি গান হল বাংলার মানুষের মনের দিক দিয়ে সবচেয়ে প্রিয়। কবি গান হল প্রত্যেকটি মানুষের আবেগ, ধর্ম চেতনা।
কবিয়াল মনি শংকর সরকার বলেন, সকল ধর্মের মানুষ এ কবিগান শোনে। সবাই এর মধ্যে আত্মাধিক চেতনার খোরাক পায়। মানুষের মনুষ্যত্ব ও সমাজকে জাগরিত করতে এবং ধর্মীয় আদর্শ তুলে ধরতে কবিগানে অংশ নেই।
শ্রোতা বনানী সাহা বলেন, মা-বাবার কাছে কবি গানের কথা শুনেছি। এখানে কবিগানের আয়োজন করা হয়েছে শুনে দেখতে আসলাম। কবিয়ালদের ধর্মতাত্ত্বিক কথা শুননাল, যুক্তি-তর্ক দেখলাম। খুই ভাল লাগছে।
শ্রোতা অসীম বিশ্বাস বলেন, আগের মত এখন আর কবিগান দেখতে পাওয়া যায়। আধুনিকতার কারনে হারিয়ে যেতে বসেছে কবিগান। খাটরা কালীবাড়ীতে কবিগান হচ্ছে শুনে দেখতে আসলাম। খুব ভাল লাগলো।
খাটরা সার্বজনীন কালীবাড়ীর সাধারন সম্পাদক উজ্জ্বল বিশ্বাস বলেন, কবি গান আমাদের সাংস্কৃতির একটি ঐতিহ্য। কবিগাস এখন হারিয়ে যাচ্ছে। প্রতুন প্রজন্মকে ধর্ম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান দিতে ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে কবি গানের আয়েজন করা হয়ছে। কবি গানের মধ্যে দিয়ে সকল ধর্মের মানুষের মধ্যে সম্প্রতির বন্ধন অটুট হবে। ধর্মীয় সম্প্রতির বন্ধন ধরে রাখতে প্রাচীন এ ঐতিহ্যবাহী কবি গান আগামীতেও আয়োজন করা হবে। #