বরগুনা জেলা প্রতিনিধিঃ
গুড়সহ ভেজাল খাদ্যসামগ্রিতে যখন দেশ সয়লাব, তখন
উপকূলীয় জেলা বরগুনার তালতলী উপজেলার বেহালা গ্রামে তৈরি হচ্ছে খাঁটি ও সুস্বাদু গোলের গুড়। প্রাচীনকাল থেকে যেমন ঘরের ছাউনিসহ নানা কাজে গোলপাতার ব্যবহার জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে ঠিক তেমনি গোল পাতার রস থেকে তৈরি গুড়ও ধরে রেখেছে তার ঐতিহ্য। এই সুস্বাদু এবং খাঁটি গুড় বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তালতলীর বেহালা গ্রামের গোলচাষীরা। সময়ের বিবর্তনে গোল পাতার ব্যবহার কমে আসলেও গোলের গুড়ের চাহিদা ও এর জনপ্রিয়তার যেনো কোনো কমতি নেই।
ম্যানগ্রোভ বা উপকূলীয় বনাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে গোল গাছ। নোনাপানি যে গাছের প্রাণশক্তি, যে গাছ নোনাপানিতে বেড়ে ওঠে সেই গাছের বাগান ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বেহালা গ্রামের ফসলী জমি জুড়ে। বংশপরম্পরায় গোলের চাষাবাদ করে আসছে অত্র এলাকার হতদরিদ্র কৃষকশ্রেণি। পৌষ থেকে ফাল্গুন, মাত্র এই তিন মাস পর্যন্ত রস আহরণ করে তারা গুড় তৈরি করতে পারেন। তবে কখনো কখনো আবহাওয়া নির্ধারণ করে থাকে এ সকল গোল চাষীদের ভাগ্য। শীতের পরে তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে কমতে থাকে রস। তখন গুড় উৎপাদন কারীরা পড়ে যান অর্থ সংকটে। এভাবেই জীবনযুদ্ধ চালিয়ে সন্তান সন্তুতি নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন ঐতিহ্যবাহী বেহালা গ্রামের গোল চাষীরা।
বেহালা গ্রামের গোলের গুড় উৎপাদনকারী কৃষক অমৃত বলেন, ‘১৫হাজার টাকায় ছয় মাসের জন্য ১০০ গোল গাছ লিজ নিয়েছি। তবে সাধারণত পৌষ থেকে ফাল্গুন এই তিন মাস গোলের রস পেয়ে থাকি আমরা। এরপর তাপমাত্রা বেড়ে গেলে রস উৎপাদন কমে যায়। তবে যেটুকু সময় আমরা পেয়ে থাকি তাতে অনেক সময় বিনিয়োগের টাকাটাও ঠিকমতো ঘরে তুলতে পারি না
বেহালা গ্রাম ঘুরে দেখা যায় প্রসিদ্ধ এই গুড় তৈরির প্রক্রিয়া। অত্যন্ত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নভাবে তৈরি করা হয়ে থাকে গোল গুড়। সকালে রস সংগ্রহ করে ধান সিদ্ধ করার ডোঙ্গায় ছেঁকে রস জ্বাল দিতে থাকেন। দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা আগুনে জ্বাল দেয়ার পর তৈরি হয় গুড়। তারপর সে গুড়কে পুনরায় ছেঁকে এবং বেশ কিছু সময় ঘুঁটে সেগুলোকে পরিষ্কার করা হয়। গোল গাছের রস থেকে উৎপাদিত গুড় যেমন সুস্বাদু তেমনি প্রসিদ্ধ এবং দামও তুলনামূলক কম। খেজুরের গুড় যেখানে তিন থেকে সাড়ে তিন শত টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে সেখানে সুস্বাদু এই গোল গুড় বাজারে বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১৮০ টাকা থেকে ২ শত টাকা। গোলের গুড় খাঁটি ও সুস্বাদু হওয়ায় এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এই গুড় নিতে আসেন অনেকেই। শুধু দেশে নয়, ইওরোপের দেশ জার্মানিতেও এই গুড় রপ্তানি করা হয়। গোল চাষীরা মনে করেন, উৎপাদিত গুড় সরকার। থেকে রপ্তানির ব্যবস্থা করা হলে এর চাষাবাদ যেমনি আরো প্রসারিত হতো, তেমনি আর্থিকভাবে লাভবান হতো গুড় উৎপাদনকারী কৃষকশ্রেণি।
কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, বরগুনার তালতলী উপজেলার বেহালা গ্রামে প্রায় বিশ হাজার গোল গাছ আছে। বরগুনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. আবু সৈয়দ মো: জোবায়দুল আলম বলেন, গোলের গুড় অত্যন্ত সুস্বাদু এবং দেশে এর ব্যাপক চাহিদাও রয়েছে। দেশের বাহিরেও এই গুড় রপ্তানি হচ্ছে। কৃষি অধিদপ্তরের পক্ষথেকে গোল চাষীদের পরামর্শ দেয়াসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করা হয়।