স্টাফ রিপোর্টার, গোপালগঞ্জ : “হয়নি যাবারও বেলা, এমন অসংখ্য গানের জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী খালিদ আনোয়ার সাইফুল্লাহ। যাবার বেলা না হলেও পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে চলে যেতে হলো “চাইম’ ব্যান্ডের ভোকালিস্ট এ গুনী সংগীত শিল্পীকে। আজ দুপুরে গোপালগঞ্জে বাদ যোহর জানাজা নামজ শেষে মা-বাবার কবরের পাশে শায়িত করা হয় এ শিল্পীকে। গুনী এ শিল্পীর বিদায়ে সংগীতাঙ্গনে শুন্যতার সৃষ্টি হলো বলে মনে করেন সহপাঠি ও ভক্তরা।
জানাযার নামাজের আগে জেলা প্রশাসনের পক্ষে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: মোহসিন উদ্দিন এবং নিহত বড় ভাই মেজবা উদ্দিন হাসান, জেলা উদীচীসহ বিভিন্ন সংগঠন শ্রদ্ধা জানিয়ে এ গুণি শিল্পীর বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
জানাগেছে, ১৯৮১ সাল থেকে গানের জগতে যাত্রা করেন জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী খালিদ আনোয়ার সাইফুল্লাহ। এরপর ১৯৮৩ সালে যোগ দেন ‘চাইম’ ব্যান্ডে। এরপর থেকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। একের পর এক হিট গান উপহার দিয়ে অল্প সময়েই খ্যাতি পান খালিদ। তার স্ত্রী ও এক ছেলে রয়েছে। তারা আমেরিকাতে বসবাস করেন।
গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় হৃদরোগে আক্রান্ত হলে রাজধানীর একটি হাসপাতালে নেয়া হয় জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী খালিদ আনোয়ার সাইফুল্লাহকে। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর রাত ১১টায় ঢাকার গ্রীন রোড জামে মসজিদে খালিদের প্রথম জানাযার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। পরে তার মরদেহ নিয়ে রাতেই গোপালগঞ্জের গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা করা হয়। পরে রাত সাড়ে তিনটায় গোপালগঞ্জ শহরের বাসায় পৌঁছায়।
খালিদের মরেদেহ গোপালগঞ্জ আনার পর পরিবারের সদস্য, সহপাঠি, বন্ধু ও ভক্তরা এক নজর দেখার জন্য ভীড় করে। অনেকে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। সৃষ্টি হয় এক শোকবহ পরিবেশের।
বাদ জোহর গোপালগঞ্জ কোর্ট মসজিদে জানাযা অনুষ্ঠিত হবার কথা থাকলেও পড়ে যে বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন সেই বিদ্যালয় এস এম মডেল সরকারী হাই স্কুল মাঠে এ সংগীত শিল্পীর জানাযা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাযার নামাজে ইমামতি করেন জেলা কোর্ট মসজিদের ইমাম মাওলানা মোঃ হাফিজুর রহমান। তাঁর জানাযার নামাজে গীতিকার-সুরকার প্রিন্স মাহমুদ, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশি, ভক্ত, শুভাকাংখী, শুভানুধ্যায়ীসহ গোপালগঞ্জের স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠনের সদস্য, স্থানীয় লোকজন, ও মসজিদের মুসল্লিসহ সহস্রাধিক মানুষ অংশ নেন।
পরে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা উদীচী সংসদসহ বিভিন্ন সংগঠন ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এরপর তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় গেটপাড়া এলাকার পৌর কবর স্থানে। সেখানে তার বাবা-মায়ের কবরের পাশে শায়িত করা হয়।
গোপালগঞ্জ জেলা উদিচির সভাপতি ও বন্ধু মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, খালিদ সাইফুল্লাহ মা–বাবার সাত সন্তানের মধ্যে সবার ছোট । তাঁর মা আনোয়ারা বেগম ও বাবা বি এ হেমায়েত উদ্দিন কেউই বেঁচে নেই। বড় ভাই ড. মহিউদ্দিন ফারুক বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী এসোসিয়েশন (বেলা) প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তিনি ১৫ বছর আগে মারা যান। এক পুত্র সন্তান অরিক মোল্লাকে নিয়ে স্ত্রী শামীমা জামান আমেরিকা বসবাস করেন। খালিদ সাইফুল্লাহ বাংলাদশের থাকতেন।
তিনি আরো বলেন, আমরা এক সাথে পড়ালেখা করতাম। খালিদ সাইফুল্লাহ ছাত্র জিবন থেকে গান গাইতো। একদিন ওর গান শোনার জন্য প্রধান শিক্ষকের কাছে ছুটির আবেদন করেছিলাম, কিন্তু সেদিন প্রধান শিক্ষক ছুটি দেননি। ছুটি শেষে আমরা সবাই মিলে তার গান শুনতাম। বাল্যবন্ধু খালিদ আজ চলে গেল। তার অভাব কোনভাবেই পুরন হবার না।
গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত শিল্পী পরিচালক প্রিন্স মাহমুদ বলেন, খালিদ ভাইয়ের সাথে আমার হবে স্মৃতি রয়েছে। খালিদ ভাইয়ের সাথে আমি ছোট বেলায় গোপালগঞ্জে এসেছি। আজও এসেছি খালিদ ভাইয়ের জন্য তবে ভাইকে চির বিদায় জানাতে। খালিদ ভাইয়ের শূন্যতা অন্যকারো দ্বারা পূরন হবে না।
খালিদ সাইফুল্লাহ ১৯৬৩ সালে গোপালগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। গোপালগঞ্জে ছোটবেলা কেটেছে খালিদ সাইফুল্লাহর। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়ার সময় থেকেই গানের প্রতি ভালোবাসা ছিলো তার। সরলতার প্রতিমা’, ‘যতটা মেঘ হলে বৃষ্টি নামে’, ‘কোনো কারণেই ফেরানো গেল না তাকে’, ‘যদি হিমালয় হয়ে দুঃখ আসে’ হয়নি যাবারও বেলা’,–এর মতো অসংখ্য জনপ্রিয় গান তিনি শ্রোতাদের উপহার দেন।
১৯৭৯ সালে এসএসসি এবং ১৯৮১ সালে এইচএসসি পরীক্ষার পর ঢাকায় যান। ভর্তি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেখান থেকে স্নাতক শেষ করে। গোপালগঞ্জে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী ১৯৮১ সাল থেকে গানের জগতে যাত্রা করেন। ১৯৮৩ সাল থেকে ‘চাইম’ ব্যান্ডে যোগ দেন।
‘সরলতার প্রতিমা’, ‘যতটা মেঘ হলে বৃষ্টি নামে’, ‘কোনো কারণেই ফেরানো গেল না তাকে’, ‘যদি হিমালয় হয়ে দুঃখ আসে’-র মতো জনপ্রিয় গানের এই শিল্পী। একের পর এক হিট গান উপহার দিয়ে অল্প সময়েই খ্যাতি পান খালিদ। কয়েক বছর ধরেই হৃদ্রোগে ভুগছিলেন খালিদ; একাধিকবার হৃদ্রোগের চিকিৎসা নিয়েছেন তিনি। একের পর এক হিট গান উপহার দিয়ে অল্প সময়েই খ্যাতি পান খালিদ, তাঁর গান এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে।