স্টাফ রিপোর্টার, গোপালগঞ্জ : আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে ও অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে ৩ কিলোমিটার এইচবিবি (ইট বিছানো) সড়ক ও ৩টি খালের উপর ৩টি ব্রীজ নির্মাণ কাজ সম্পন্ন না করে বিলের সমুদয় অর্থ উত্তোলন করে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
এ ঘটনায় জেলা পরিষদের অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এতে অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ মিলেছে। আজ বুধবার সকালে দুর্নীতি দমন কমিশন গোপালগঞ্জ কায্যালয়ের উপ-পরিচলক মো. মশিউর রহমানের নেতৃত্বে একটি দল এ অভিযান পরিচালনা করেন।
সরেজমিনে গিয়ে ও জেলা পরিষদ সূত্রে জানাগেছে, গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার ওড়াকান্দি ইউনিয়নের মাঝকান্দি গ্রামের মাঝকান্দি-খাগড়াবাড়িয়া সড়কের তিনটি খালের উপর এলাকাবাসীর যাতায়াত দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে ২০১৫ সালের শুরুতে গোপালগঞ্জ জেলা পরিষদ তিনটি ব্রীজ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ওই বছরই টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করে জেলার কাশিয়ানী উপজেলার মেসার্স হাবীব এন্ড কোং নামে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সে ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর কার্যাদেশ দেয়া হয়। এই কাজে প্রথম বিল পরিশোধ করা হয় ৫৪ লক্ষ ৭ হাজার ২১৭ টাকা এবং দ্বিতীয় বিল পরিশোধ করে ২৬ লক্ষ ১২ হাজার টাকা। আর ২০১৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারী ঠিকাদারের রক্ষিত জামানত ৪ লক্ষ ৪৮ হাজার ৭২১টাক ফেরৎ দেয়া হয়েছে। এই কাজের মূল্য নির্ধারণ ছিল ৯০ লক্ষ টাকা। মেসার্স হাবীব এন্ড কোং নামের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটি কাজ পেলেও আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সে কাজটি করেন সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক সাইফুল ইসলাম।
তবে ২০১৭ সালে তিনটি ব্রীজের এ্যাপ্রোচ নির্মাণ না করে জনগনের যাতায়াত ব্যবস্থা না করেই কাগজে-কলমে কাজ শেষ করা হয় প্রকল্পের কাজ। আর এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের কোন উপকার না হলেও তদারকী প্রকৌশলীদের পকেটে লাখ লাখ টাকা গেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। পরবর্তীতে স্থানীয় বাসিন্দারা একটি ব্রীজে ওঠানামা করার জন্য বাঁশের মই তৈরী করে ব্যবহার করে আসছে। তাতে অনেক দূর্ঘটনাও ঘটেছে, পঙ্গুত্ববরন করেছে অনেকেই। অপর দু’টি ব্রীজের এ্যাপ্রোচে স্থানীয় ওড়াকান্দি ইউপি চেয়ারম্যান ৪০ দিনের সৃজনশীল কর্মসূচীর শ্রমিক দিয়ে মাটি কেটে লোকজনের যাতায়াতের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
তবে অভিযোগ উঠেছে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকায় আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে মেসার্স হাবীব এন্ড কোং নামে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান থেকে কাজটি বাগিয়ে নেন সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক সাইফুল ইসলাম। কাজ শেষ না করেই জেলা পরিষদের কর্মকর্তাদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে আওয়ামী লীগের প্রভাব দেখিয়ে ফাইলে স্বাক্ষর করিয়ে বিল তুলে নেন। এমনকি এ্যাপ্রোচ সড়ক না করলেও জামানতের পুরো টাকা তুলে নেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় স্বাক্ষর করাসহ বিল দিতে বাধ্য হন কর্মকর্তারা।
এদিকে, অভিযোগের ভিত্তিতে, আজ বুধবার সকালে দুর্নীতি দমন কমিশন গোপালগঞ্জ কায্যালয়ের উপ-পরিচলক মো. মশিউর রহমানের নেতৃত্বে একটি দল জেলা পরিষদে অভিযান পরিচালনা করে। অভিযান পরিচালনাকালে ফাইলপত্র যাচাই বাছাই করে অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ মেলে।
মাইজকান্দি গ্রামের বাসিন্দা আমিরুল ইসলাম তালুকদার ও মোঃ হাসন মোল্লা বলেন, গোপালগঞ্জ জেলা পরিষদ থেকে আড়কান্দি ব্রিজ হতে মাইজকান্দি হয়ে আড়ুয়াকান্দি খাল পর্যন্ত ৩টি ব্রীজসহ এইচবিবি রাস্তা নির্মাণ করা হয়। কাজের মান একেবারেই ভালো ছিল না, আমরা অনেকবার এর প্রতিবাদ করেছি, তাতে কোন কাজ হয়নি। জেলা পরিষদের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মনির হোসেন ও সহকারী প্রকৌশলী মোঃ আনিচুর রহমান কাজ বুঝে নিয়েছেন। সেসময়ে তারা বলেছে ব্রীজে ওটার ব্যবস্থা করা হবে, কিন্ত করেননি। ঠিকাদার গোপালগঞ্জ শহরের প্রভাবশালী লোক হওয়ায় আমরা ভয়ে কিছু বলতেও পারিনি।
একই গ্রামের মোঃ বেল্লাল খান ও মিতা বেগম বলেন, এ ব্রীজ পারাপার হতে গিয়ে প্রতিনিয়ত দূর্ঘটনা ঘটছে। আমাদের দাবী গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও জেলা পরিষদ প্রশাসক বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করিয়ে আমাদের যাতায়াত ব্যবস্থা বরে দিবেন।
ওড়াকান্দি স্কুলের ৭ম শ্রেনীর শিক্ষার্থী মিরাজুল তালুকদার বলে, বর্ষা মৌসুমে আমাদের স্কুলে যেতে সমস্যায় পড়তে হয়। অনেক সময় স্কুলে যেতে পারি না। আমাদের দাবী যেন সরকটি করে দেয়া হয়।
স্থানীয় ওড়াকান্দি ইউপি চেয়ারম্যান বদরুল আলম বিটুল বলেন, আমার ইউনিয়নের মাইজকান্দি-খাগড়াবাড়িয়া সড়কে আড়কান্দি খালের উপর জেলা পরিষদ তিনটি ব্রীজ নির্মাণ করেছে ২০১৭ সালে। কিন্তু ব্রীজগুলির এ্যাপ্রোচ না করেই অফিস কাজ সমাপ্ত দেখিয়ে ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ করেছে। যে কারনে ওই এলাকার বাসিন্দারা দীর্ঘ ৯ বছর ব্রীজটি ব্যবহার করতে পারছে না। আমি আমার ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ৪০ দিনের সৃজনশীল কর্মসূচীর লেবার দিয়ে দু’টি ব্রীজের এ্যাপ্রোচে মাটি দিয়ে জনগনের হাটার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। অন্যটিতে গ্রামবাসী বাঁশের মই লাগিয়ে ওঠানামা করে। আমার দাবী দ্রুত ব্রীজ তিনটির এ্যাপ্রোচ নিমাণ করে জনগনের যাতায়াত সুবিধা সৃষ্টি করা হোক।
জেলা পরিষদের সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মনির হোসেন বলেন, যে সময় ব্রীজের কাজ হয় তখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। এর ব্রীজের কাজ করেছে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক সাইফুল ইসলাম। তিনি ব্রীজের কাজ শেষ না করে আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে অস্ত্রের মুখে ফাইলে সই করিয়ে অর্থ তুলে নেন।
৫ আগষ্টের পর দেশে না থাকায় গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক সাইফুল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
দুর্নীতি দমন কমিশন কায্যালয়ের উপ-পরিচলক মো. মশিউর রহমান বলেন, গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলার ওড়াকান্দি ইউনিয়নের মাইজকান্দি থেকে আড়কান্দি গ্রাম পর্যন্ত প্রায় ৩ কিলোমিটার এইচবিবি (ইট বিছানো) সড়ক ও ৩টি খালের উপর ৩টি ব্রীজ নির্মাণ কাজ সম্পন্ন না করে জেলা পরিষদের কর্মকর্তা ও ঠিকাদার বিলের সমুদয় অর্থ উত্তোলন করে আত্মসাৎ করে বলে অভিযোগ ওঠে। পরে আজ অভিযান চালিয়ে ফাইলপত্র যাচাই বাছাই করে অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ মেলে। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হবে এবং পর্বর্তীতে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসক মুহম্মদ কামরুজ্জামান বলেছেন, আমি এ ব্যাপারে সরজমিনে পরিদর্শন করে জনগনের যাতায়াত সুবিধার জন্য যে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন সেই পদক্ষেপ গ্রহন করা হবে। যাতে ওই এলাকার জনগনের যাতায়াতের আর কোন সমস্যা সৃষ্টি না হয়। #