স্টাফ রিপোর্টার, গোপালগঞ্জ : সাথি বেগমের বয়স ২০ বছর। নিয্যাতনে শারীরিক অসুস্থতা আর মেয়েকে হারিয়ে মানসিকভাবে কিছুটা ভারসাম্যহীন হয়ে পরেছিলেন। এখন ঠাঁই হয়েছে হাসপাতালে বেডে। হাসপাতালে বেডে থেকেও যেন ভুলে যায়নি মমত্ববোধ। সুযোগ পেলেই মেয়েকে জড়িয়ে ধরে চুম একে দিচ্ছে কপালে আর দুই গালে। মানসিক ভারসাম্য কিছুটা হারালেও চোখের কথাই যেন বুঝিয়ে দিচ্ছেন কেমন ছিলো পারিবারিক নিয্যাতন। একমাত্র কন্যা সন্তানকে স্বামী বিক্রি করে দিলেও সেই সন্তানকে ফিরে নিয্যাতনের ঘতে যেন কিছুটাও হলেও প্রলেপ পড়েছে।
নেশাগ্রস্থ বাবা মাদকের টাকা যোগাতে মাত্র ২ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছিল মেয়েকে। বিষয়টি জানার পর মা সাথি বেগম নিজের রক্ত বিক্রি করে দুই হাজার টাকা ফেরত দিয়ে একমাত্র মেয়েকে ফিরিয়ে আনে। মায়ের এই ভালবাসার একমাত্র মেয়ের বয়স এখন মাত্র ৮ মাস। পরম মমতায় মেয়েকে নিয়ে সাথী বেগমের দিন কাটছে এখন রাস্তায় রাস্তায়।
পা নিয়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে ভিক্ষার বিষয়টি নজরে আসে “স্বপ্ন ফেরিওয়াল ”নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যদের। মা ও মেয়ের চিকিৎসার জন্য গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়েছে সংগঠনটি। এ যেন সিনেমার গল্পকেও হার মানায়।
সাথি বেগমের সাথে কথা বলে জানাগেছে, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার বোয়ালিয়া গ্রামের সাথী বেগমের মা দ্বিতীয় বিয়ে করলে তার বাবাও দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এরপরই সৎ মায়ের সংসারে নানাভাবে নির্যাতনের শিকারের এক পর্যায়ে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বলাকইড় উত্তরপাড়া গ্রামের মুরাদ মোল্ল্যার সাথে বিয়ে দেয়া হয় সাথী বেগমকে। কয়েক মাস সুখের সংসার হলেও এরপর সাথী বেগমের উপর নেমে আসে নির্যাতন। মুখ বুঝে নির্যাতন সহ্য করার বছর খানের পর তাদের সংসার আলোকিত করে আসে ফুটফুটে একটি কন্যা সন্তান। এরই মধ্যে নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েন স্বামী মুরাদ মোল্ল্যা। নেশার টাকা জোগাড় করতে না পারায় ৪ মাস বয়সী কন্যা সন্তানকেই মাত্র ২ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন পাষন্ড নেশাগ্রস্থ বাবা মুরাদ মোল্লা। এরপর বিভিন্নভাবে খোঁজ খবর নিয়ে মাসখানেক আগে নিজের রক্ত বিক্রি করে দুই হাজার টাকা ফেরত দিয়ে একমাত্র মেয়েকে ফিরিয়ে আনে পরম মমতাময়ী মা সাথী বেগম।
মাদকসেবী ও বহু বিবাহ করা স্বামী নাড়িছেড়া সন্তানকে বিক্রি করে দেয়ায় সম্পর্কের ছেদ টানেন সাথী বেগম। ফলে বাবার বাড়ী আর স্বামীর বাড়ীহীন সাথী বেগমের ভালবাসার একমাত্র মেয়ের নিয়ে রাস্তায় ঠাঁয় হলে ঘুরে বেড়ান এদিক-সেদিকে। তবে মাস খানেক আগে সাথী বেগমের পায়ের উপর দিয়ে রিক্সার চাকা উঠে গেলে ভেঙ্গে যায় পা। ফলে অর্থের অভাবে চিকিতসা করতে না পারায় পা বেকে যাওয়া সার্জারী করানো জরুরি হয়ে পড়েছে। হাসপাতালে পরিবার পাশে না থাকায় হাসপাতালে নার্স ও অন্যান্য রোগীর স্বজনরাই যেন তার আপন হয়ে উঠেছে। মা আর মেয়েকে তারাই দেখাশোনা করছেন।
পা ভাঙ্গা অবস্থায় হাসপাতাল বেডে শুয়ে সাথি বেগম আরো বলেন, যে স্বামী আমার সন্তানকে বিক্রি করে দিতে পারে তার সাথে কোন সম্পর্ক নেই। ভিক্ষা করেই যদি খেতে হয় তাহলে স্বামী দিয়ে কি হবে। মেয়েকে এভাবেই বাঁচাবো। আমি এখন রাস্তার মানুষ।
স্বামীর বিচার চান কি না এমন প্রশ্নের জবাবে সাথি বেগম বলেন, বিচার চেয়ে কি হবে? জানোয়ারকে শাস্তি দিয়ে কি মানুষ বানানো যায়? তাকে কোথায় খুঁজে পাবেন যে শাস্তি দিবেন? আমি বিচার চাই না, আমি নিরাপদ একটা আশ্রয় চাই। সেখানে মেয়েকে নিয়ে নিরাপদে থেকে কাজ করে মেয়েকে মানুশের মত মানুষ করতে পারবো।
স্বপ্ন ফেরিওয়ালা সংগঠনের সাধারন সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম বলেন, সাথি বেগম পা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সন্তান কোলে মানুষের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করছে। এই দৃশ্য দেখে এই অবস্থার কথা জানতে চাই। তখন সাথি বেগম তার জীবনের করুণ কাহিনী আমার কাছে বলেন। বিষয়টি সংগঠনকে জানালে সকলের সিদ্ধান্ত নিয়ে সাথি বেগমের চিকিৎসার জন্য আমরা উদ্যোগ গ্রহণ করি এবং চিকিৎসা করতে হাসপাতালে নিয়ে আসি। ডাক্তার দেখানো হয়েছে। ডাক্তার সাথিকে ভর্তি করেছেন। অপারেশন করলে রোগী সুস্থ হয়ে যাবেন বলে আমাদের জানান। আমরা সংগঠনের পক্ষ থেকে চিকিৎসার খরচ বহন করতে প্রস্তুতি নিয়েছি।
স্বপ্ন ফেরিওয়ালা সংগঠনের সভাপতি মিজানুর রহমান মানিক বলেন, সাথি বেগম নিজেই একজন বাচ্চা আর তার সাথে রয়েছে আরো একটি বাচ্চা। আমরা তার চিকিৎসা করাছি। তবে তার দাবী একটি নিরাপদ আশ্রয়ের। আমরা চেষ্টা করবো তাকে একটি নিরাপদ আশ্রয় দিতে। মমতাময়ী এ মায়ের চিকিৎসার জন্য সমাজের বৃত্তবানদের এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি।
গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা: জীবিতেষ বিশ্বাস বলেন, সাথি বেগম ও তার কণ্যা সন্তানকে চিকিসাসেবা দেয়া হচ্ছে। তবে সাথি বেগমের পায়ের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেয়া প্রয়োজন। #