ঝালকাঠির সন্ধ্যা নদীতে অভিযান-১০ লঞ্চ দুর্ঘটনার ৯ দিন পেরিয়ে গেলেও তালতলীর নিখোঁজ নানি রেখা বেগম (৬০) ও নাতি জুনায়েতের (৭) সন্ধান মেলেনি। পরিবার নিখোঁজদের জীবিত থাকার আশা ছেড়ে দিয়েছেন।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিখোঁজ পরিবারের কোনো খোঁজখবর নেয়নি এবং সহযোগিতাও করেনি- এমন অভিযোগ নিখোঁজ জুনায়েতের বাবা জাহাঙ্গীর সিকদারের।
জানা গেছে, তালতলী উপজেলার জাকিরতবক গ্রামের জাহাঙ্গীর সিকদার জীবন-জীবিকার তাগিয়ে গত পাঁচ বছর পূর্বে ঢাকায় যান। ঢাকায় ভ্যান চালিয়ে তিনি পরিবার পরিজনের ভরণপোষণ করতেন।
গত ১৬ ডিসেম্বর স্ত্রী সোনিয়া বেগম দুইপুত্র সন্তান জুনায়েত, জোবায়ের ও মা রেখা বেগমকে নিয়ে ঢাকায় স্বামী জাহাঙ্গীর সিকদারের কাছে যান। গত ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতে বরগুনাগামী অভিযান-১০ লঞ্চে ওঠেন। লঞ্চের ডেকে বিছানা পেতে মা ও দুই পুত্রসন্তানকে নিয়ে বসে ছিলেন সোনিয়া।
গভীর রাতে ঝালকাঠির সন্ধ্যা নদীর মাঝে লঞ্চে আগুন লাগলে সোনিয়া টের পেয়ে জেগে উঠেন। মা ও পুত্র জুনায়েতকে ডেকে তুলে নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু প্রচণ্ড ধোয়া ও আগুনের প্রচণ্ড তাপে রেখা বেগম ও বড়ছেলে জুনায়েতকে হারিয়ে ফেলেন।
জীবন বাঁচাতে এক বছরের শিশুপুত্র জোবায়েরকে কোলে নিয়ে নদীতে ঝাঁপ দেন তিনি। তাদের স্থানীয়রা উদ্ধার করে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। কিন্তু মা রেখা বেগম ও বড়পুত্র জুনায়েত নিখোঁজ হন। স্বজনরা রেখা বেগম ও জোবায়েরকে হাসপাতাল ও প্রশাসনের উদ্ধার করা লাশের মধ্যেও খুঁজে পাননি।
এরপর ৯ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত তাদের কোনো সন্ধান মেলেনি। পরিবার তাদের বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিয়েছেন। এদিকে গত ৯ দিনে নিখোঁজ পরিবারের কোনো খোঁজখবর নেয়নি এবং সহযোগিতা করেনি উপজেলা প্রশাসন- এমন অভিযোগ নিখোঁজ জুনায়েতের বাবার। মা ও পুত্রসন্তানকে হারিয়ে দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া সোনিয়া বেগম পাগলপ্রায়। তিনি তার পুত্রসন্তান এবং মাকে ফিরে পেতে চান।
অপরদিকে মাকে হারিয়ে মাদ্রাসাপড়ুয়া শিশুকন্যা সুমি বেগম মূর্ছা যাচ্ছে। সে তার মায়ের লাশটা ফেরত চায়।
বেঁচে যাওয়া সোনিয়া আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, মুই মোর মানিকরে চাই। মোর বুকের ধন জুনায়েতকে ফিরাইয়্যা দ্যান। মোর কিছুই লাগবে না মুই মোর পোলা ও মায়রে চাই।
সুমি বেগম বলেন, মা তো বেঁচেই নেই কিন্তু মায়ের লাশটা চাই। লাশটা পেলেও নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারতাম মা মারা গেছেন। এখন সেই সান্ত্বনা দেওয়ারও কোনো ভাষা নেই।
নিখোঁজ জুনায়েতের বাবা ও রেখা বেগমের জামাতা জাহাঙ্গীর সিকদার বলেন, হাসপাতাল, নদী ও প্রশাসনের উদ্ধার করা লাশের মধ্যে খুঁজলাম কিন্তু কোথাও আমার ছেলে ও শাশুড়ির খোঁজ পেলাম না। এখন ধরেই নিয়েছি তারা জীবিত নেই। লাশ দুটি পেয়েও নিশ্চিত হতে পারতাম যে তারা মারা গেছেন কিন্তু এখন নিশ্চিত হতেও পারছি না।
তিনি আরও বলেন, গত ৯ দিন পেরিয়ে গেলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা তো দূরের কথা খোঁজখবর পর্যন্ত নেয়নি। মনে হচ্ছে আমরা পাপ করেছি।
তালতলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. কাওছার হোসেন বলেন, নিখোঁজ ও নিহতের বিষয়ে জেলা প্রশাসক সব পদক্ষেপ নিচ্ছেন; কিন্তু উপজেলা প্রশাসনের হাতে এ বিষয়ে কিছুই করণীয় নেই।
সূত্র ঃযুগান্তর