• ২৫শে জুন, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ , ১১ই আষাঢ়, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার খবরে দিশাহারা ভোলার জেলেরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত অক্টোবর ৬, ২০২২, ০৭:০৭ পূর্বাহ্ণ
২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার খবরে দিশাহারা ভোলার জেলেরা

মোঃ ইসমাইল

ভোলা সদর উপজেলার ধনিয়া ইউনিয়নের ৭০ বছর বয়সী জেলে মো. শাহাজাহান মাঝি। ছোট বেলা থেকেই মেঘনা নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন তিনি। তার সংসারে তিন ছেলে ও এক মেয়ে। দুই ছেলে বিয়ে করে আলাদা হয়ে গেছেন। এক ছেলে এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। বর্তমানে তার সংসারে এক সন্তানসহ তিন সদস্য। প্রথমে নিজের মাছ ধরার ট্রলার থাকলেও আট বছর ধরে তিনি অন্যের ট্রলারে সাধারণ জেলে হিসেবে কাজ করছেন। আগে নিজের ট্রলার চালিয়ে সংসারে খরচ মেটানোর পরও বছরে কিছু টাকা সঞ্চয় করতেন। কিন্তু এক যুগ ধরে সেটা আর হয়ে উঠছে না। নদীতে ইলিশের সংখ্যা কমে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পরে নিজের ট্রলারটিও বিক্রি করে দিয়েছে। এখন অন্যের ট্রলার ইলিশ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে তাকে। কিন্তু তাও সম্ভব হচ্ছে না।

জানা গেছে, নদীতে ইলিশ কম থাকায় সারাদিন নদীতে থেকেও ট্রলারের তেলের খরচও ওঠে না। গত বছরের তুলনায় এ বছর মাছের সংখ্যা আরও কম গেছে। তাই প্রতিদিনই লোকসান গুনতে হচ্ছে জেলেদের। তাই ধারদেনা করেই চলছে তারা। এরই মধ্যে আবার এনজিও সংস্থার ঋণের সাপ্তাহিক কিস্তি পরিশোধের চিন্তা।

শাহনাজ মাঝি জানান, আগে নদীতে কোনো অভিযান ছিল না। প্রায় সারাবছরই মাছ শিকার করা যেত। বর্তমানে বছরের প্রায় ৫ মাস সাগরেও নদীতে নিষেধাজ্ঞা থাকে। তাই ভরা মৌসুমে মাছ না পাওয়া গেলে অন্য সময় নদীতে মাছ শিকারের সময় থাকে না। এ ছাড়াও সরকার নিষেধাজ্ঞাকালে যে সহয়তা দিয়ে থাকেন তা একেবারে সামান্য। জেলে কার্ড না থাকায় অনেক জেলেই এ সহায়তা থেকে বঞ্চিত। তাই বাধ্য হয়ে অনেক জেলেকে  মাছ শিকারে নদীতে গেলে জেল-জরিমানার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। শুধু শাহনাজ মাঝিই নন, ভোলার মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীতে মাছ শিকার করা প্রায় সকল জেলেরই একই অবস্থা।

বুধবার (৫ অক্টোবর)  সকালে তুলাতুলি মাছঘাটে গেলে কথা হয় জেলে মো. শাহে আলম, মো. শফিক ও মো. শেখ ফরিদসহ ১০-১৫ জনের সাথে।  তাঁরা জানান, সরকার নদীতে মাছ বৃদ্ধির জন্য অভিযান দেয়। কিন্তু অভিযানের পর ভরা মৌসুমে নদীতে মাছের দেখা মেলে না। তাই ধারদেনা করে চলতে হয় জেলেদের। বড় ধরনের কোনো সমস্য হলে এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়।আবার এ ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়।

তাঁরা আরও জানান, সরকার কয়েক মাস আগে মার্চ ও এপ্রিল দুই মাস নদীতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এরই মধ্যে নদীতে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হচ্ছে ৭ অক্টোবর থেকে। এ বছর ভরা মৌসুমে ইলিশ তেমন দেখা মিলেনি। গত সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে কিছুটা ইলিশের দেখা মিলতে না মিলতেই ডাক পড়েছে অভিযানের। এ রকম হলে জেলেদের আর উপায় থাকবে না।আবার সরকার জেলেদের জন্য যে সহায়তা দিয়ে থাকে তাও পুরোপুরি পায় না বলে অভিযোগ করেন জেলেরা।

জেলেরা দাবি করেন নিষেধাজ্ঞাকালীন জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত চাল নিষেধাজ্ঞার শুরুতেই সঠিক ভাবে বন্টন, নিষেধাজ্ঞাকালীন এনজিওর ঋণের কিস্তি মওকুফের ব্যবস্থা করাও যে সকল জেলে এখনোও নিবন্ধনের বাইরে রয়েছে তাদেরকে দ্রুত নিবন্ধনের আওতায় আনার পাশাপাশি যারা জেলে পেশায় নেই তাদের জেলে কার্ড বাতিলের দাবি করেন জেলেরা।

জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় আগামী ৭ অক্টোবর থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ২২ দিন ভোলার মেঘনা- তেঁতুলিয়া নদীর ১৯০ কিলোমিটার এলাকায় সকল ধরনের মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞাকালীন নদীতে মাছ ধরা, ক্রয়-বিক্রয়, মজুদ ও পরিবহন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে ভোলার এক লক্ষ ৪৭ হাজার নিবন্ধিত জেলেদের মধ্যে এক লাখ ৩২ হাজার জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়া হবে।

ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোল্লা এমদাদুল্যাহ জানান, ইতিমধ্যে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে প্রচা-প্রচারণাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নিষেধাজ্ঞাকালীন ছেলেদের জীবিকা নির্বাহের জন্য এক লক্ষ ৩২ হাজার জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল দেয়া হবে। ইতিমধ্যে  ছেলেদের জন্য চাল বরাদ্দ হয়েছে। আশাকরি অভিযান শুরুর সাথে সাথে তা জেলেদের মাঝে পৌঁছানো যাবে। এছাড়া এনজিও কিস্তির ব্যাপারে এনজিওগুলোর সাথে আলোচনা করা হবে। যাতে অভিযানের সময় এনজিওর কিস্তি বন্ধ থাকে।