বরগুনা জেলাঃ করোনা অতিক্রান্ত শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশের লক্ষে বরগুনায় মাসব্যপি শিশু আনন্দ মেলা চলছে। সার্কিট হাউস সংলগ্ন মাঠে বরগুনা প্রেসক্লাব শিশু আনন্দ মেলার আয়োজন করেছে। শিশুদের ইচ্ছেমত বিনোদনের জন্য নানা ধরণের খেলাধূলার আয়োজন রয়েছে মেলায়। প্রতিদিন হাজার হাজার অভিভাবক শিশুদের নিয়ে মেলায় আসছেন। মেলা নানা ধরণের বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি খেলাধূলার আয়োজন উপভোগ করে ফিরছেন বাড়িতে। শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনা অতিক্রান্ত শিশুদের জন্য এমন এক আয়োজন সময়োপযোগী ও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের নিয়ে মেলায় আসা অভিভাবকরাও এমন আয়োজনকে সাধুবাদ জানিয়েছেন।
বরগুনার গৌরীচন্না ইউনিয়নের ধুপতি মনসাতলী এলাকার বাসিন্দা মাসুমা বেগম দুই নাতী-নাতনীকে নিয়ে শিশু আনন্দ মেলায় এসেছেন। মাসুমা বলেন, গত দুই তিন বচ্ছরে মোর নাতি নাতনিগো লইয়া যে এট্টু ঘোরতে যামু এইরমহ কোনো পরিবেশ পাইনায়। শিশু মেলার কতা হুইন্না নাতিরা জ্বালাইয়া লইছে। ওগো তাড়নায় মেলায় আইছি। এইহানে আইয়া ওরা ইচ্ছামত খেলাধূলা করছে। মজার মজার খেলনা কিনছে। ওগো হাসিমুখ দেইখ্যা মোরও ভালো লাগছে। এইডা যারা করছে হেগো ধন্যবাদ জানাই।’ মাসুমার মতই শুক্রবার বিকেল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বরগুনা শিশু আনন্দ মেলায় শিশুদের নিয়ে এসেছেন হাজার হাজার অভিভাবক। মেলায় শিশুদের ১৫ ধরণের রাইডস রয়েছে। সেবস রাইডসে চড়েছে শিশুরা। ফেরার সময় বাহারীসব খেলনা নিয়ে ফিরেছে বাড়িতে।
আয়োজক কর্তৃপক্ষ বরগুনা প্রেসক্লাবের সভাপতি সঞ্জিব দাস জানান, ‘‘প্রত্যেকটি মানুষের শরীরে যেমন পুষ্টি দরকার, তেমনি মস্তিষ্কেরও পুষ্টি দরকার হয়৷ মস্তিষ্কের পুষ্টি হলো ভালো চিন্তা৷ সারা দিন ফেসবুক-ইউটিউবে থাকলে মস্তিষ্কের সৃজনশীলতা নষ্ট হয়ে যায়৷ চিন্তায় পরিবর্তন আসে৷ ভালো চিন্তা বাদ দিয়ে খারাপ চিন্তাগুলো মস্তিষ্কে ভর করে৷ আচরণ পালটে যায়, মানুষের সঙ্গে ব্যবহারও খারাপ হতে থাকে৷দীর্ঘক্ষণ ইলেক্ট্রোনিক ডিভাইস ব্যবহার করলে নানা ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি দেখা দেয়৷ বিশেষ করে শিশুদের ওপর এর প্রভাব অত্যন্ত বেশি৷ শিশুরা মোবাইল হ্যান্ডসেট অনেকক্ষণ ব্যবহার করলে তাদের স্মৃতি ও দৃষ্টিশক্তি লোপ পায়৷ শরীরে টিউমার হতে পারে৷ রেডিয়েশনের প্রভাবে একটা শিশুর মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্থ হয়ে থাকে করেনা অতিক্রান্ত শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশের লক্ষেই আমরা গত ৫ অক্টোবর বরগুনা সার্কিট হাউস সংলগ্ন মাঠে মাসব্যপি শিশু আনন্দ মেলার কার্যক্রম শুরু করি। শুরুর পর থেকে প্রত্যেকদিন বিকেলে অভিভাবকরা শিশুদের নিয়ে মাঠে আসেন। শিশুরা নানা ধরণের রাইডসে চড়ে, ঘুরে বেড়ায় ইচ্ছেমত। পছন্দমত খেলনা কিনে নিয়ে যায়। মেলার একমাস শিশুদের অবাধ বিচরণ ও শরীর চর্চায় সুযোগ থাকছে। আমরা আশা করি এই মেলার মধ্য দিয়ে শিশুরা ভার্চুয়াল জগত ছেড়ে বাস্তবতায় ফিরে আসবে।
বরগুনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট সোহেল হাফিজ কে জানান, আমরা এই প্রথম শিশু মেলার এ ধরনের বিনোদনের ব্যবস্থা করি। এখানে সাধারণ শিশুদের পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ও পথশিশুদের বিনোদনের সুযোগ রাখা হয়েছে। সম্পূর্ণ বিনামুল্যে তাদের এ সুযোগ করে দিয়েছি শুধু মানবিক মল্যবোধ থেকেই। কারণ তারাও সমাজের মানুষ।” এই মেলায় ১৫ ধরনের রাইড আছে। শিশু আনন্দমেলাটিতে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বিনোদন প্রেমী শিশু ও অভিভাবকদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন দায়িত্বে থাকা কর্মীরা। মেলা চলবে মাসব্যাপী। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিনামূল্যে বিনোদনের সুযোগ করেছি। তিনি আরো বলেন, পিতৃমাতৃহীন, বিনোদন বঞ্চিত, দরিদ্র ও অসহায় শিশুদের বিনোদনের জন্যে বরগুনা প্রেসক্লাব এক ব্যাতিক্রমী উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। প্রতিদিন ২০ জন অসহায় শিশুকে বিনামূল্যে প্রেসক্লাব আয়োজিত শিশু আনন্দমেলার প্রতিটি ইভেন্ট উপভোগের সুযোগ থাকছে।
বেসরকারি উন্নয়ণ সংগঠন সিপিডবির বরগুনায় শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশে কাজ করছে। সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন মিরাজ বলেন, করোনায় শিশু কিশোররা ২ বছরেরও বেশি সময় গৃহবন্দি হয়ে ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যেই দিন-রাত সময় কাটিয়েছে। বেশিরভাগই শিশু ও অভিভাকরা বলেছেন, পড়ার বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নেই বললেই চলে৷ লেখাপড়ায় মনোযোগ নেই আগের মতো৷ পুরো সময় কাটছে টিভি দেখে আর স্মার্ট ডিভাইসে৷ দিন-রাতের রুটিন বদলে গেছে৷ অনেকের আচরণে এসেছে পরিবর্তন৷ এমন পরিস্থিতিতে সনÍানদের নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকেরা৷ আমাদের জেলায় স্কুল-কলেজেগুলোতে বিনোদনের ব্যবস্থা নেই। এই অবস্থায় বরগুনা প্রেসক্লাব শিশু আনন্দ মেলার আয়োজন করেছে যা সময়োপযোগী ও শিশুদের জন্য বিবেচনাপ্রসূত একটি সিন্ধান্ত। আমরা মনে করি গত দুই বছরের শিশুরা যে মানসিক ও শারীরিক বিকাশে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এক মাসে শিশুদের ক্ষেত্রে অনেক ডেভলপ করবে।’
বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত¡াবধায়ক ও শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সোহরাব উদ্দীন মনে করেন, শারীরিক ক্ষতির চেয়েও শিশুদের মানসিক ক্ষতিটা বেশি হচ্ছে। তিনি মনে করেন‘‘করোনার দুই বছরে শিশুদের মারাত্মক কিছু ক্ষতি হয়েছে৷ এর মধ্যে মানসিক ক্ষতিটা অনেক বেশি৷ পাশাপাশি অনেক শিশু মোটা হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় শিশুদের উন্মুক্ত বিনোদনের বিকল্প নেই। শিশু আনন্দ মেলা সত্যি একটি ব্যতিক্রমি উদ্যোগ। আয়োজকদের এমন চিন্তাকে আমি সাধুবাদ জানাচ্ছি।
ইউনিসেপ বাংলাদেশের চাইল্ড প্রটেকশন স্পেশালিষ্ট জামিলা আক্তার বলেন,২০২০ সালের মার্চে করোনা মহামারী শুরুর পর ইউনিসেফ শিশুদের নিয়ে একটা গবেষণা প্রকাশ করে৷ সেখানে বলা হয়েছে, বিশ্বের ১৮৮টি দেশে লকডাউন বা অন্যান্য কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের কারণে ১০৬ কোটির বেশি শিশুর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গবেষনায় শিশুদেরকে ভার্চুয়াল জগত থেকে বের করে উন্মক্ত বিনোদনের ব্যবস্থা করার বিষয়ে জোর সুপারিশ করা হয়।
শিশুর জন্য বৈষম্যহীন অবস্থা, শিশুর নিরাপত্তা, বিকাশ, শিশুদের মতের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ, পারিবারিক পরিবেশ ও বিকল্প যতেœর ব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে শিশুর অংশগ্রহণের অধিকার ইত্যা