আসাদুল ইসলাম, গাইবান্ধা
কাতার বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা শেষ হওয়ার সাড়ে তিন মাস অতিবাহিত হলেও দেশের উত্তরের জনপদ গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় এখনো ওড়ছে ভিনদেশি পতাকা। এসব পতাকা টাঙানো অবস্থায় রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ও শীতে স্যাঁতসেঁতে হয়ে বাতাসে ছিঁড়ে ও বিবর্ণ হয়ে গেছে। ফলে পতাকার অসম্মান ও মর্যাদা হানি করা হচ্ছে। তাই টাঙানো পতাকা যথাযথ ভাবে নামিয়ে সম্মানের সাথে সংরক্ষণ করার দাবি সচেতন মহলের।
সুন্দরগঞ্জ পৌরশহরসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এখনো ওড়ছে ভিনদেশি পতাকা। এসব স্থানে বাংলাদেশের পতাকার সঙ্গে অন্য দেশের পতাকা ওড়লেও তা অন্য দেশের পতাকার তুলনায় অনেক ছোট। কাতার বিশ্বকাপ ফুটবল শেষ হওয়ার সাড়ে তিনমাসেও এসব পতাকা নামানো হয়নি। ফলে পতাকাগুলো রোদে পুড়ে গেছে। ইতোমধ্যে বৃষ্টিতে এসব পতাকা ভিজে ও শীতে স্যাঁতসেঁতে হয়ে বাতাসে ছিঁড়েছে ও বিবর্ণ হয়ে গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার বিভিন্ন এলাকায় আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ছাড়াও ফ্রান্স, জার্মানি, পর্তুগাল, ক্রোয়েশিয়া, মরক্কো, স্পেনসহ বিভিন্ন দলের ফুটবলের সমর্থকরা তাদের বাসা-বাড়ির ছাদ, গাছের ডাল, বাঁশের খুঁটিতে এসব দেশের পতাকা টাঙিয়েছে। এই পতাকাগুলো এখনো পত পত করে ওড়ছে৷
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশে পতাকা ওড়ানোর নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে তেমনি সরকারের পক্ষ থেকে ভিনদেশি পতাকা ওড়ানোর রয়েছে আলাদা বিধি। কেউ কেউ শুধু ভিনদেশি পতাকা একটি খুটির সঙ্গে বেঁধে দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ একই খুটিতে জাতীয় পতাকার সঙ্গে ভিনদেশি পতাকা উড়িয়েছেন। বাংলাদেশের পতাকা আইন ১৯৭২-এর বিধি অনুযায়ী বিদেশী পতাকা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে যে কোনো বিদেশী পতাকা উত্তোলন করতে হলে সঙ্গে একটি জাতীয় পতাকাও ওড়াতে হবে। দুটি পৃথক স্তম্ভে উত্তোলন করতে হবে দুটি পতাকা। এক্ষেত্রে জাতীয় পতাকার নিচে থাকবে ভিনদেশি পতাকাটি। পতাকার সাইজটা একই সমান হতে হবে এবং বাংলাদেশের পতাকা ডানদিকে থাকবে। সূর্যাস্তের আগেই আবার পতাকা নামিয়ে ফেলতে হবে। এছাড়াও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের রয়েছে নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন। জাতীয় পতাকা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নির্দেশ করে। সব সরকারি ভবন, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকার নির্ধারিত ভবনে প্রতি কর্মদিবসে পতাকা উত্তোলনের বিধান রয়েছে।
সচেতন মহল বলছেন, জাতীয় পতাকা একটি দেশের স্বাধীনতা, সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালীন সময়ে ভিনদেশি পতাকা টাঙিয়ে সেই দলের সমর্থন করা হয়েছিল। কিন্তু বিশ্বকাপ ফুটবল শেষ হওয়ার সাড়ে তিনমাস পেরিয়ে গেলেও সেই পতাকাগুলো নামানো হয়নি। যারা পতাকা টাঙিয়েছে তাদের উচিত পতাকা নামিয়ে সম্মানের সাথে সংরক্ষণ করা। এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি ও পদক্ষেপ গ্রহণে স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। তাহলেই পতাকার সম্মান ও মর্যাদা অটুট থাকবে।
আরিফুল ইসলাম নামের একজন আর্জেন্টিনার সমর্থক বলেন, ‘বাড়িতে প্রিয় দল আর্জেন্টিনার পতাকা টাঙিয়েছি। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ ফুটবলে প্রিয় শিরোপা জিতেছে। আমার কয়েকজন বন্ধু ব্রাজিলের সমর্থক তাদেরকে ক্ষেপানোর জন্যঅই এখনো পতাকা নামাইনি। এতে আনন্দ পাই।’
ব্রাজিল ফুটবল দলের সমর্থক লিমন মিয়া নামের এক তরুণ বলেন, ‘বিশ্বকাপ শুরুর অনেক আগেই প্রিয় দলের পতাকা টাঙিয়েছি। সেই পতাকা এখনো ওড়ছে। তবে রোদে পুড়ে পতাকার রং চটে গেছে। এখন পতাকাটা নামাবো।’
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তারাপুর ইউনিয়ন চাচিয়া গ্রামের ফুটবল প্রেমিক বিপুল ইসলাম আকাশ বলেন, ‘একটি দলের খেলা আমার খুব ভালো লাগে। ভালোবেসে সেই দলের পতাকাও টাঙিয়েছিলাম। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরদিনই সেই পতাকা নামিয়ে সংরক্ষণ করেছি। সবার উচিত পতাকাগুলো নামানো এবং যত্মসহকারে সংরক্ষণ করে রাখা।’
লেখক ও সংগঠক কঙ্কন সরকার বলেন, ‘জাতীয় পতাকা একটি দেশের স্বাধীনতা, সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। প্রত্যেক দেশের জাতীয় পতাকাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানো দরকার। আর এই পতাকা উঠানো এবং নামানোর ক্ষেত্রে যথাযথ সম্মান ও নিয়মের মাধ্যমে সম্পন্ন করা কর্তব্য। আমরা দেখি বিশ্বকাপ ফুটবল কিংবা বিশ্বকাপ ক্রিকেট কিংবা জাতীয় বা আন্তর্জাতিক ভাবে আয়োজিত খেলার সময়ে কোনো দলের প্রতি সমর্থন বা ভালোবাসা জানাতে উক্ত দলীয় দেশের জাতীয় পতাকার মাধ্যমে জানাই। আর তা জানাতে সে দেশের পতাকা টাঙানোর ক্ষেত্রে কোনো কোনো সময় নানা রকমের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হই।’
তিনি আরও বলেন, ‘কিছুদিন আগে শেষ হয়ে যাওয়া বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার সময়ও এমন হয়েছে। কিন্ত, খেলা শেষ হবার বেশ সময় পরেও টাঙানো পতাকা আর নামিয়ে রাখি না। ফলে আমাদের জাতীয় পতাকাসহ অন্যান্য দেশের পতাকা টাঙানো অবস্থায় রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, শীতে স্যাঁতসেঁতে হয়ে বাতাসে ছিঁড়ে কিংবা বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এটি এক ধরনের অসম্মান কিংবা মর্যাদা হানি করা হচ্ছে না কি! তাই যারা টাঙিয়েছি তাদের টাঙানো পতাকা যথাযথ ভাবে নামিয়ে সম্মানের সাথে সংরক্ষণ করা দায়িত্ব ও কর্তব্য বলে মনে করি। পাশাপাশি এ ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টিতে ও পদক্ষেপ গ্রহণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণেরও আহ্বান জানাই।’
সুন্দরগঞ্জের সাহিত্য সংগঠন ‘সুপ্রকাশ সাহিত্য সংসদ’র উপদেষ্টা ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক সঞ্জয় সরকার বলেন, ‘দেশপ্রেম মানুষের একটি অনন্য গুণ। এই গুণটি মানুষকে অর্জন করতে হয় বোধ ও মেধার সমন্বয়ে। আধুনিক বিশ্বে যেকোন প্রান্তের যেকোনো ঘটনা আমাদেরকে আন্দোলিত করে। বিশ্বকাপ ফুটবলও তেমনি। বর্তমানে খেলাধুলার সাথে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদ পরস্পর জুড়ে গেছে। কিন্তু ফুটবলকে কেন্দ্র করে যে পতাকা প্রদর্শনের সংস্কৃতি চালু হয়েছে সেটির নিয়ন্ত্রণ প্রদর্শন না করলে উৎসবের আনন্দে বিতর্ক তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এখনো ভিনদেশি পতাকা উড়তে দেখা যায় বিভিন্নখানে অথচ বিশ্বকাপ শেষ বহু আগে। আমরা আনন্দ ভাগাভাগি করবো কিন্তু এও ভুললে চলবে না যে পতাকাটি কখন নামাতে হবে।’
বিধিবহির্ভূতভাবে ভিনদেশি পতাকা ওড়ানো হয়েছে উল্লেখ করে বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় আমাদের জাতীয় পতাকার সাথে একই খুঁটিতে বিধিবহির্ভূতভাবে ভিনদেশি পতাকা ওড়ানো হয়েছে৷ খেলা শেষ হওয়ার