• ২১শে জুন, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ , ৭ই আষাঢ়, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শেষ জীবনে গ্রামে এসে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন-প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত জানুয়ারি ১৩, ২০২৪, ১৩:২৮ অপরাহ্ণ
শেষ জীবনে গ্রামে এসে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন-প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

স্টাফ রিপোর্টার, গোপালগঞ্জ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর শেষ জীবনে গ্রামে এসে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করে বলেছেন, আমি গ্রামে এসে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াবো, ভ্যানে করে ঘুরবো। ঢাকা শহরেতো আমার বাড়ি ঘরও নেই। গ্রামে এসে গ্রামের বাড়িতেই শেষ জীবন কাটানোর ইচ্ছে প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা বলেন, কোটালীপাড়া-টুঙ্গিপাড়ার মানুষই আমার আপনজন। আমার এই নির্বাচনটাও তারা করে দিয়েছেন। কাজেই আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। আমি সবচেয়ে বড় সৌভাগ্যবান যে আমার নিজের জায়গা নিয়ে চিন্তা করতে হয়না। সবাই ছুটাছুটি করে, কিন্তু আমি তো সময় পাইনা। আমাকে সারা বাংলাদেশ দেখতে হয়। এবারের নির্বাচনেও আপনারা করেছেন। বিশেষ করে মহিলাদের মিছিল দেখে এতো ভাল লেগেছে যে বলতে পারবো না।

আজ শনিবার (১৩ জানুয়ারী) বিকেলে টুঙ্গিপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত টুঙ্গিপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় একথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, তিনি বলছিলেন আমরা নাকি ১০০ বছরে ক্ষমতায় আসতে পারবো না। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী তো দুরের কথা কখনো বিরোধী দলীয় নেতাও হতে পারবে না। আসলে আল্লাহ কাকে যে কখন কি করে তা ঠিক করে রেখে দেয়। তার অভিশাপ আমার জন্য আশির্বাদ হয়ে যায়, আর তার জন্য প্রযোজ্য হয়ে যায়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে ৯০ ভাগ মুসলমান। আমি একটা মুসলিম দেশের মেয়ে হয়ে সে ৫-পাঁচ বার ক্ষমতায় আসলো এটা অনেক দেশের পছন্দ না। চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র এখনও শেষ হয়নি। ষড়যন্ত্র এখনো আছে। এই খুনিরা, চক্রান্তকারীরা যুদ্ধাপরাধী যাদের বিচার করেছি তাদের একটা চক্রান্ত আছে। আন্তর্জাতিক পয্যায়ে একটা চক্রান্ত আছে। ষড়যন্ত্রটা এই জন্য যে আমাদের দেশের ভৌগলিক অবস্থান এরকম, আমাদের দেশটার উপর অনেকেরই নজর আছে। কাজেই এখানে বসে কেউ অন্য দেশের উপরে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালাবে, এখান থেকে অন্য দেশে বিমান হামলা করবে, সেট আমি মেনে নিবো না। আমার স্বাধীন, স্বর্বভৌম দেশ, আমরা স্বাধীন ভাবেই চলবো। আমরা ছোট হতে পারে, দেশ ছোট কিন্তু জনগনই আমার বড় শক্তি।

নির্বাচন নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, একটি চক্রান্ত ছিল, আমাকে আসতে দিবে না, তাদের হুকুমের দাস কাউকে বসাবে তারপরে এ দেশটাকে নিয়ে খেলতে পারবে। বাংলাদেশের জনগণ তার ভাল জবাব দিয়েছে। আমি যখন নির্বাচন উন্মুক্ত করে দিলাম যে যেভাকে দাঁড়াতে পারে। উদ্দেশ্য ছিল আমার ভোট যেন আসে, আর প্রতিযোগীতা যেন হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো বলেন, বিএনপি নির্বাচন করবে না। ওরা যে করবে না সেটা আমরা জানি। ওরা করবে যে ওদের নেতা কোথায়? যে দল নির্বাচন করে তার সমানে কেউ একজন থাকে, যে প্রধানমন্ত্রী হবে, দেশ চালাবে। ওদের তো সেরকম যোগ্য কেউ নেই। একজনতো দূর্নীতিবাজ, দূর্নীতি আর এতিমদের অর্থ আত্মসাত মামলার সাজাপ্রাপ্ত, আরেকজনতো গ্রেনেড হামলা, অস্ত্র চোরাকারবারী, মানি লন্ডারিং। মানি লন্ডারিং এটা আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই তারাই খুঁজে বের করেছে এবং তারা স্বাক্ষী দিয়ে গেছে। ওই আমেরিকান গোয়েন্দাদের স্বাক্ষীতে তাদের সাজা হয়েছে। তবে এদের লজ্জা নেই। ওরা এরকম করবে আবার কখন কারে পছন্দ করে নিয়ে আসে তার ঠিক নেই। আসলে বিএনপির সামনে কোন নেতৃত্ব নেই তাই নির্বাচন করবে না, তবে নির্বাচন বানচাল করতে চেয়েছে। আগুন দিয়ে পোড়ানো, সবেচেয়ে জঘন্য কাজ রেলে আগুন দিয়ে মা ও ছোট্ট শিশু যেভাবে পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেলো, তারপর ফিস প্লেট তুলে ফেলা, বগি ফেলে দেয়া, যাত্রীসহ বাসে আগুন দিয়ে পোড়ানো। ২০১৩ সালেও আগুন দিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, ১৪ তে করলো, ১৫ তে করলো, এবারও শুরু করলো। ২৮ অক্টোবর পুলিশকে ফেলে যেভাবে পিটিয়ে মারা, তারপর সাংবাদিকদের উপর পেটানো, প্রধান বিচারকের বাড়ীতে হামলা জঘন্য কর্মকান্ড তারা করে নিজেদেরকেই জনগণ থেকে বিচ্ছন্ন করে দিলো। এরআগে যতদিন শান্তিপূ্র্ণভাবে মিছিল মিটিং করছিল আমরা বাঁধা দেইনি, করে যাচ্ছিল। তখন তাদের অবস্থাটা ভাল হচ্ছিল। কিন্তু ২৮ অক্টোবরের পর যখন তাদের আসল রূপ বের হলো, তাদের সন্ত্রাসী চেহারাটা মানুষ দেখলো, অ্যাম্বুলেন্সে রোগী যাচ্ছে আক্রমণ করলো, রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে ঢুকে পুলিশ হাসপাতালে আক্রমণ করলো, সেখানে কতগুলো অ্যাস্বুলেন্স ভাঙ্গলো, পোড়ালো।

হাসপাতালে কি কেউ আক্রমণ করে প্রশ্ন তুলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, হাসপাতালে কেউ আক্রমণ করে, ওই ইসরাইল তারা করছে প্যালেষ্টাইনে, আর আমাদের এখানে তারেক জিয়ার হুকুমে বিএনপি-জামাত তারা করলো আমাদের দেশের মানুষের উপর। অ্যাম্বুলেন্স ও হাসপাতালে হামলা করে দেখালো ওরা ইসরাইলের প্রেতাত্মা।

শেখ হাসিনা আরো বলেন, আমাদের সতর্কতার সাথে চলতে হবে। আমরা নতুন কেবিনেট করেছি। সেটাও তাদের লাগে। শুনলাম বলছে এতো তাড়াতাড়ি কেন সরকার করলো। আমাদেরতো সব তৈরী আছে আমরা করবো না কেন? আমরা সিদ্ধান্ত নিতে কখনো পিছপা হইনা। জানি নির্বাচন হবে। নির্বাচনে জিতলে কি করবো এটা তো আগেই তৈরী করা থাকবে। তাহলে সময় লাগবে কেন? আমি সময় নষ্ট করবো কেন? আমার কাছে একটা দিনেরও মূল্য আছে। আমাদের তো উন্নয়নের ধারাটা অব্যাহত রাখতে হবে।

শেখ হাসিনা আরো বলেন, আবার দেখলাম তাদের অফিসের তালা ভাংচ্ছে। সেই রবীন্দ্রনাথের গানটাই মনে পড়ে ”ভেঙ্গে মোর ঘরের চাবি, কে আমারে নিয়ে যাবি” আমি ঠিক জানি না রিজভী সাহেব এই গান গাইতে গাইতে তালা ভাংচ্ছিলো কিনা। আর তালা ভেঙ্গে কাকে বের করলো তাও জানি না। বলে যে চাবি খুঁজে পাচ্ছে না, তাহলে তালাটা লাগালো কে? এই তালার কোন সিলগালা ছিলো না কাজেই এটা পুলিশ লাগায়নি। একটা ভালো তালা তারা হাতুড় দিয়ে ভাংচ্ছে। এটা একটা নাটক। এই নাটক করে করে মানুষকে কিছু দিনের জন্য ধোকা দেয়া যায়। সব সময়ের জন্য না। যারা মদদদাতা তারা আবার খুশি হয়ে কাছে টেনে নেয়।

উন্নয়নের ধারা অব্যহতা থাকবে জানিয়ে সরকার প্রধান বলেন, এখন আমাদের সবচেয়ে বড় কাজ হচ্ছে এই উন্নয়নের ধারাটা অব্যাহত রাখা। জিনিসের দাম যেটা বেড়ে গেছে সেটা নিয়ন্ত্রণ করা, আমি গ্রামেগঞ্জে খুব অসুবিধা দেখি না। কিন্তু যারা নিদিষ্ট আয়ের মধ্যে তাদের একটু সমস্যা। ঢাকার শহরে একটু বেশি। সেখানে জীবনযাত্রার ব্যয় সবসময় একটু বেশি। বাজারে কিন্তু জিনিসের অভাব নাই। খাদ্যের কোন ঘাটতি নাই। কিন্তু মনে হয় যে কেউ জিনিসের দাম বাড়িয়ে মানুষকে হয়রানি করে। সেটাও আমাদের যথাযথভাবে নজরদারি বাড়াতে হবে। আর আমাদের উৎপাদনটা বাড়াতে হবে।

এর আগে, সকাল ৯টায় গণভবন থেকে সড়ক পথে টুঙ্গিপাড়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বেলা সাড়ে ১১টায় টুঙ্গিপাড়ায় পৌঁছান শেখ হাসিনা। বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি সৌধ বেদিতে পুস্পস্তাপর্ক অর্পণ করে গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন প্রধানমন্ত্রী। এসময় তিন বাহিনীর একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করেন। পরে বোন শেখ রেহানাকে সাথে নিয়ে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের শহীদ সদস্য এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে অত্মত্যাগকারী শহীদের আত্মার শান্তি কামনা করে ফাতেহা পাঠ ও বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন। পরে দলীয় প্রধান হিসাবে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী পরিষদের সদস্যদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানান।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, অর্থ মন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, আইন মন্ত্রী আনিসুল হক, শিল্প মন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মো: তাজুল ইসলাম, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যাটন মন্ত্রী মুহাম্মদ ফারুক খান, পররাষ্ট্র মন্ত্রী মোহাম্মদ হাসান মাহমুদ, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, খাদ্য মন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার, পরিকল্পনা মন্ত্রী আব্দুস সালাম, ধর্ম মন্ত্রী মো. ফরিদুল ইসলাম. বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবীর নানক, স্বাস্থ মন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন, রেল মন্ত্রী মো. জিল্লুল হাকিম, জন প্রশাসন মন্ত্রী মো. ফরহাদ হোসেন, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী, শিক্ষা মন্ত্রী মহিবুর হাসান চৌধুরী, শেখ হেলাল উদ্দিন এমপি, শেখ সালাউদ্দিন জুয়েল এমপিসহ মন্ত্রী পরিষদের সদস্য, প্রতিমন্ত্রীগণ ও ৫ উপদেষ্টা উপস্থিত ছিলেন।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বঙ্গবন্ধু ভবনে অবস্থান করে মধ্যাহ্ন ভোজ ও নামাজে অংশ নেন। পরে দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজ বাসভবনে নবনিযুক্ত মন্ত্রীদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে অংশ নেন। রাতে তিনি নিজ বাড়ীতে রাত্রী যাপন করবেন।

সফরের দ্বিতীয় দিন রবিবার (১৪ জানুয়ারী) দুপুর ২টায় সড়ক পথে টুঙ্গিপাড়া থেকে কোটালীপাড়া উপজেলায় যাবেন। পরে জেলা আড়াইটায় উপজেলা পরিষদ মাঠে নেতাকর্মীদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে যোগ দিবেন। পরে সেখান থেকে বিকালে সড়ক পথে ঢাকার উদ্দেশ্যে কোটালীপাড়া ত্যাগ করবেন।

প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে জেলা জুড়ে বইছে আনন্দের বণ্যা। মোড়ে মোড়ে টাঙ্গানো হয়েছে ব্যানার, ফেস্টুন, প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে তোড়ন। প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে জেলা জুড়ে নেয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। #