• ২১শে জুন, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ , ৭ই আষাঢ়, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আতংক ছড়াচ্ছে ঢাকা-নারায়নগঞ্জ ফেরত মানুষ – আসছে ট্রলারে ট্রলারে

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত এপ্রিল ১৬, ২০২০, ০৫:২৩ পূর্বাহ্ণ
আতংক ছড়াচ্ছে ঢাকা-নারায়নগঞ্জ ফেরত মানুষ – আসছে ট্রলারে ট্রলারে

সাইদুর রহমান পান্থ, বরিশাল ব্যুরো
বরিশালে প্রানঘাতি করোনা ভাইরাসে বেশ কয়েকজন আক্রান্ত হয়োর পর গত রোববার জেলা প্রশাসন পুরো জেলা লকডাউন ঘোষণা করে। তবে এই লকডাউন মানছে না অনেকেই। লকডাউনের কারণে তেমন কোন পরিবর্তন পাওয়া যায়নি নগরীর ভেতরে। তবে নগরী থেকে বয়ে যাওয়া হাই হওয়েতে বেশি কঠোরতা ছিল। যেন বহিরাগতরা বরিশালে প্রবেশ করতে না পারে। কিন্তু ঢাকা ও নারায়নগঞ্জ থেকে নানা মাধ্যমে বরিশালে ঢুকছে। ঢাকা ও নারায়নগঞ্জ ফেরত মানুষগুলো আতংক ছড়াচ্ছে বরিশালে। এমনকি মঙ্গলবার রাতে মেহিন্দগঞ্জ ও হিজলা এলাকা থেকে একটি বাল্কহেড ও দুই ট্রলারে ২৬১ জন যাত্রীকে আটক করা হয়েছে। নৌ পুলিশের এসআই সঞ্জয় মন্ডল বলেন, তারা ঢাকা বাদামতলি ও নারায়নগঞ্জ থেকে বরিশাল ও পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালি যাচ্ছিল। এদিকে সেনাবাহিনী, র‌্যাব ও পুলিশ সদস্যরা সচেতনতায় নিরলস কাজ করলেও ত্রাণ সামগ্রী না পাওয়া আর অসচেতনতায় লকডাউন মানছে না নিম্ম ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষরা। জেলার বিভিন্ন স্থানে মানা হচ্ছে না সামাজিক দুরত্বও। এতে করে ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। বুধবার পর্যন্ত বরিশালে চিকিৎসক-র্নাসসহ মোট ৯ জনের শরীরে করোনা সনাক্ত হয়েছে।
খোজঁ নিয়ে জানা গেছে, সোমবার ভোরে নগরীর আমির কুটির এলাকায় ঢাকার সাভার থেকে বরিশালে এম্বুলেন্সের আসেন এক নারী। তিনি সাভারের একটি স্কুরের শিÿক। বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ্য। তাই সে তার বোনের বাসায় বরিশালে এসে ওঠে। এ ঘটনা জানা জানি হয়ে গেছে আতংক ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়। পরে স্থানীয়রা কোতয়ালী মডেল থানাকে জানালে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। তাকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখার নির্দেশ দেয় পুলিশ। এদিকে তার নমুনা সংগ্রহ করার জন্য শেবাচিম হাসপাতাল ও সিভিল সার্জনকে জানানো হয়েছে। এ নিয়ে ওই এলাকায় কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এদিকে বরিশাল সদর উপজেলার সায়ে¯Íাবাদ এলাকায় গত ৫দিন আগে ঢাকা থেকে এক লোক এসেছেন। যিনি করোনার উপসর্গ অনুভব করে সোমবার বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে গিয়েছে। তবে তাকে প্রথম অবস্থা কোন চিকিৎসা না দেয়ার পর পুলিশের সহযোগিতায় করোনা পরীÿার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়। নগরীর ২২ নং ওয়ার্ড জিয়া সড়ক মদিনা মসজিদ এলাকায় সৌরভ নামে এক ব্যক্তি গত ৪দিন আগে শিবচর উপজেলা থেকে এসেছেন। তাকে ঘরে থাকতে বলা হলেও তিনি বাহিরে ঘোড়াফেরা করছেন। এ ঘটনায় এলাকায় আতংক বিরাজ করছে। একই ভাবে নগরীর বাজার রোড এলাকায় ঢাকা থেকে ফেরত এক ব্যক্তির মৃত্যু নিয়ে কৌতুহলের সৃস্টি হয়েছে। যদিও তার স্বজনরা প্রভাবশালী বলে কোন রূপ পরীÿা না করে তার অন্তষ্টক্রীয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। এ ঘটনায় এলাকায় আতংক বিরাজ করছে। এদিকে বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়ায় করোনা আতঙ্কে একটি পরিবারকে লকডাউন করে দিয়েছে এলাকাবাসী। করোনা ঝুকি নিয়ে ঢাকা থেকে দুই বোন বাবার বাড়িতে আসায় ওই পরিবারকে লকডাউন করে দিয়েছে বিক্ষুদ্ধ এলাকাবাসী। ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার গৈলা ইউনিয়নের উত্তর শিহিপাশা গ্রামে। স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন যাবত ঢাকায় বসবাস করে আসছিলেন মৃত আমজেদ হাওলাদারের বড় মেয়ে ফেরদৌসি বেগম ও ছোট মেয়ে মুনমুন বেগম। করোনা ভাইরাস সংক্রমন দেখা দেওয়ার মধ্যে গত সপ্তাহে ঢাকা থেকে বাবার বাড়িতে আসেন। দুই বোনের বাড়ি আসার খবর জানাজানি হলে এলাকায় করোনা আতঙ্ক ছড়িয়ে পরায় রবিবার সন্ধ্যায় বিক্ষুদ্ধ এলাকাবাসী ওই বাড়ির সামনে জড়ো হয়ে বাড়ির প্রবেশ পথে বাঁশ দিয়ে আটকে দিয়ে লাল নিশান টানিয়ে দেয়। গৈলা ইউপি চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম টিটু বলেন, তিনি ইউপি সদস্যের মাধ্যমে ঘটনা জানতে পেরে ওই পরিবারের সাথে কথা বলে বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করেন। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশ অনুযায়ী তাদেরকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি এলাকাবাসীকে আতঙ্কিত না হয়ে ওই দুই বোনের করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে বরিশাল শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ২ রোগির শরীরে করোনা ভাইরাসের সংক্রমন সনাক্ত ও ওই দুই রোগি গ্রামের বাড়ি ও কর্মস্থলের ওপর বিশেষ নজরাদারি জোরদার করেছে স্থানীয় প্রশাসন। যারমধ্যে মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার চরগোপালপুর ইউনিয়নের কাজিরচর গ্রামের বাসিন্দা আক্রান্ত হওয়ায় মুন্সি বাড়িসহ আশপাশের কয়েকবাড়ি মিলিয়ে ১ কিলোমিটার এলাকাকে আলাদাভাবে লকডাউনের আওতায় এনেছে উপজেলা প্রশাসন। এছাড়া অপর করোনা পজেটিভ ব্যক্তির কর্মস্থল জনতা ব্যাংকের বাকেরগঞ্জ উপজেলার কলসকাঠি ইউনিয়ন শাখা, ডিজিটাল ক্লিনিক নামে একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রদান কেন্দ্র ওই ব্যক্তির বাড়িসহ ৮ টি বাড়ি মিলিয়ে দশমিক ৫ কিলোমিটার এলাকা আলাদাভাবে লকডাউনের আওতায় আনা হয়েছে। অন্যদিকে নগরীর ঘনবসতি এলাকা পলাশপুর, রসুলপুর, পোর্টরোড মৎস্য বাজার এলাকাগুলোতে সাধারন মানুষের মাঝে করোনার আতঙ্কতো নেই সেই সাথে এই মহামারিকে গুরুত্ব দিচ্ছে কেউ কেউ তাই তারা এখনো বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে দলবদ্ধতা হয়ে আড্ডাবাজী করতে দেখা যাচ্ছে।
অপরদিকে রোববার থেকেই মানুষকে নিজ ঘরে রাখতে এলাকা ভিত্তিক টহল বৃদ্ধি করেছে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ (বিএমপি)। তারা নগরের বিভিন্ন সড়ক, মহাসড়কে চেকপোষ্ট ও টহলের মাধ্যমে পুলিশ সরকারি নির্দেশনা বা¯Íবায়নের লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে। নগর ও জেলার গেটওয়েগুলোতে নজরদারি বাড়িয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। জরুরি সেবায় নিয়োজিত ব্যতিত কোন যানবাহন বরিশালে বিশেষ করে নগরে প্রবেশ করেত দেয়া হচ্ছে না। এছাড়া গৌরনদী-কালকিনী (ভূরঘাটা)সীমানায় যৌথ টহলের ব্যবস্থা করন সহ জিগজ্যাগ পদ্ধতির মাধ্যমে যানবাহন প্রবেশ মনিটরিং করার পাশপাশি পায়ে হেঁটে প্রবেশ বন্ধ করা হয়েছে।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) মোঃ খাইরুল আলম জানান, হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়াসহ জরুরী সেবার আওতায় থাকা পরিবহন ও ব্যক্তিদের বাহিরে বরিশাল নগরে গত কয়েকদিন ধরেই কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না, তেমনি এখান থেকে কেউ বাহিরেও যেতে দেয় হয়নি। আর পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে, যা বা¯Íবায়নে পুলিশের সদস্যরা সড়ক, মহাসড়কে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। তিনি আরো বলেন, প্রাণঘাতি মহামারীর ভয়াবহ প্রকোপ থেকে নগরবাসীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কেউ প্রবেশ ও বাইরে যেতে পারবে না। তিনি বলেন, নিজ নিজ অবস্থানে থেকে আমরা সবাই সচেতন হয়ে অপরকে সচেতন করে তুলতে পারলে মরনব্যাধি করোনা ভাইরাসের প্রকাপ থেকে আমরা নিরাপদে থাকবো। আর করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নিতে সবাই ঘরে থাকুন। অযথা বিনা প্রয়োজনে কেউ ঘরের বাইরে বের হলে তাকে গ্রেফতার সহ আইনানুগ ব্যাবস্থা নেয়া হবে।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোঃ শাহাবুদ্দিন খান বলেন, হোম কোয়ারেন্টিন, সামাজিক দুরত্ব নিশ্চিত করন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য পুলিশ বাহিনী প্রথম থেকেই এখানে কাজ করছে। আর বরিশাল জেলা বিশেষ করে বরিশাল মেট্রোপলিটন এলাকা বিভাগের বাকী জেলাগুলোতে যাওয়ার গেটওয়ে। তাই আমরা এখানে বেশকিছু চেকপোষ্ট বসিয়ে সম্পূর্ণভাবে যানবাহন নিয়ন্ত্রন করছি। ##